Showing posts with label ডাকপিয়ন. Show all posts
Showing posts with label ডাকপিয়ন. Show all posts

Thursday, November 24, 2022

যে স্বপ্ন দেখা কখনোই শেষ হয়না

রাত বাজে ৩ টা,, ৬ তলায় থাকা একটি ব্যালকনি থেকে কেউ একজন রাতের আকাশ দেখছে। পাশের বাসার বিড়াল টি মাঝে মাঝে মিউ মিউ করছে সম্ভবত ব্যালকনিতে কাউকে দেখেই করছে। সামনের বাসার ছাদে ফুটে থাকা হাস্নাহেনা ফুলের সেন্ট আসছে। চাঁদের আলোয় আলোকিত চারিদিক। মায়াময় লাগছে সবকিছু।  ছেলেটি আনমনে সব যেনো দেখছে। যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই রাতের নিরবতা পূর্ণ সৌন্দর্যের প্রেমে মজেছেন কবি সাহিত্যিক রা।  কোনো দিকে খেয়াল নেই। হঠাৎ নিস্তব্ধতা ভেঙে ঘেউ ঘেউ করে উঠলো দূরের দুটি কুকুর। 


এমন সময়-- "শিশির, ঐ শিশির! তুমি কই?" রুমের ভেতর থেকে ডাক দিয়ে বললো একটি মেয়ে। 

ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটি জবাব দিলো এইতো ব্যালকনিতে। 

ভেতর থেকে আর জবাব এলোনা। কিছুক্ষণ পরে একটি মেয়েলী ছায়া রুমের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে প্রশ্ন করলো, এই এতো রাতে এখানে কেনো। শরীর খারাপ করবে, ভেতরে চলো। বলে জবাবের অপেক্ষা না করেই একরকম টানতে টানতে ছেলেটিকে ভেতরে টেনে নিয়ে গেলো। 

এতক্ষণ যাদের কথা বলছিলাম, তারা হলো সোনেলা আর শিশির। দুজনে বিয়ে করেছে সম্প্রতি। একই সাথে পড়তো দুজনেই। চোখাচোখি, বন্ধুত্ব, ভালোলাগা,,লুকোচুরি,, প্রণয় তার পর বিবাহ। ফলস্বরূপ দুই পরিবারের কেউই পুরোপুরি মেনে নেয়নি। তবে পরিস্থিতি বুঝাচ্ছে যে মেনে নিবে একসময়। তাদের সংসার খারাপ চলছেনা। শিশির জব করে, তাতে যা স্যালারি আসে, তাতে ভালোভাবেই চলে যায় দিন। বাসাভাড়া, খাওয়া দাওয়া সব মিলিয়ে ২০ হাজার টাকার মতো লাগে দুজনের সারা মাসে। 


হাতে সামান্যই থাকে তবুও শিশির একে একে সোনেলার পছন্দ গুলা পুরণ করার চেষ্টা করে। সোনেলা কিছুই চায়না প্রয়োজনের বাইরে।  অফিস থেকে আসার পরেই ফ্রেশ হয়ে শিশির সোনেলাকে বলে চলো একটু হেটে আসি। সোনেলাও ঝটপট রেডি হয়ে নেয়। বাসা থেকে বের হয়ে সোনেলাকে ফুচকা খাওয়ায় কোনোদিন, আবার কোনোদিন বা আইসক্রিম। অথচ শিশির কিছুই খায়না শুধু চা ছাড়া। কারন তার ওগুলা ভালো লাগেনা। মাঝে মাঝে সোনেলা জোর করে খাইয়ে দেয় কিছু। তার পর দুজনে দুজনের হাত মুঠি করে ধরে বাসায় ফিরে আসে৷


শিশির দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে পা ছড়িয়ে, সোনেলা এসে বিছানার অপর প্রান্তে বসে৷ শিশির কিছুক্ষণ পরে সোনেলাকে বলে, এই এদিকে এসো একটু কাজ আছে। সোনেলা মৃদু হেসে তার দিকে এগিয়ে যায়। কারন সে জানে শিশির কি করবে, এটা তার নিত্য দিনের অভ্যেস। 


কাছে গেলেই শিশির সোনেলাকে টেনে শুইয়ে দিবে কোলের উপর। তার পর মাথার চুল গুলা খুলে দিবে। আস্তে আস্তে চুলে বিলি কাটবে আর গল্প করবে। আর একে একে প্রশংসা করবে সোনেলার চোখের। টুপ করে মুখ নিচু করে দু চোখে চুমু খাবে আর বলবে, তোমার চোখেই যে আমার মরন হয়ে যাবে গো ঘুমবেবি। সোনেলাকে অনেক আদুরে নামে ডাকে শিশির। 

সোনেলা কৃত্তিম রাগ দেখিয়ে, মুখ ঘুরিয়ে বলবে- ধ্যাত, খালি আদিখ্যেতা, ভাল্লাগেনা। 

শিশির আবার তাকে জাপটে ধরবে। মুখ ফিরায় নিবে তার পর সারা মুখে চুমু দিয়ে ভরে দিবে। আস্তে আস্তে সোনেলার মিথ্যা রাগ ভাঙ্গাবে। 


এক বছর কেটে যায়। নভেম্বর মাস। বাচ্চা কনসিভ করেছে সোনেলা। শিশির খুব খুশি। সোনেলাকে বলে মাত্র বাচ্চা কনসিভ হয়েছে, সময় থাকতে চলোনা পাগলী ঘুরে আসি চট্টগ্রাম। সোনেলা খুব খুশি হয়ে যায়।

১১ই নভেম্বর, শিশির সেদিন রাতের টিকিট কাটে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে। রাত ১০:৪৫ এ গাড়ি। আরামবাগ কাউন্টার থেকে, Soudia Mercedes-Benz এ। সোনেলার আনন্দ যেনো আর ধরেনা। কারন সে এর আগে সাগর আর পাহাড় ছবিতেই দেখেছে শুধুমাত্র। আর সোনেলার আনন্দ দেখে শিশিরের মন পাগল হয়ে যাচ্ছে। রাত ৮:৩০ এ বাসা থেকে বের হয়ে দুজনে উবার নিয়ে চলে গেলো বাস কাউন্টারে। 


শিশির দু প্যাকেট চিপস কিনলো, সাথে কোকাকোলা। গাড়িতে উঠার সাথে সাথেই শুরু হলো বৃষ্টি। সৌদিয়া বাস তার ক্ল্যাসিকাল স্পিডে চলা শুরু করলো। সোনেলা প্রচন্ড ভাবে ফিল করছিলো তার সময় গুলা। শিশিরের গায়ে মাথা রেখে বললো- "আচ্ছা শিশির আমি তোমার কে হই।"

 শিশির তার মাথা তুলে দিলো। তার পর সোনেলার মুখ খানি নিজের দিকে ফিরিয়ে চোখে চোখ রেখে বললো, "তুমি আমার অক্সিজেন। আমার সবটুকুই তুমি। তুমি শুধু আমার কলিজার টুকরাই নও বরং পুরো কলিজাটাই তুমি।" 

সোনেলার দুচোখে পানি, শিশির তার হাত দিয়ে পানি গুলা মুছে এনে নিজের মুখে মাখিয়ে নিলো। বললো, "এই পাগলী! কান্না করোনা, তোমার কান্না আমার সয়না লক্ষীটি, আমার বুক ভেঙে যায়, প্লিজ একটু হাসো।" ফিক করে হেসে দিলো সোনেলা। শিশির ও সোনেলাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরলো। রাতের বৃষ্টি ভেজা পথ দিয়ে সাই সাই করে গাড়ি ছুটে চলছে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে। 


রাত প্রায় ৪ টার দিকে চৌদ্দগ্রাম টাইমস্কয়ার হাইওয়ে রেস্টুরেন্টে গাড়ি থামলো ২০ মিনিটের জন্য। সোনেলা আর শিশির ও নামলো। সোনেলার হাত ধরে শিশির লেডিস ওয়াশরুমের সামনে এলো। সোনেলা ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এলো। দুজনে মিলে হালকা কিছু নাস্তা করলো। যদিও বুফে ফ্রি ছিলো টিকিটের সাথেই। কিন্তু শিশির আর সোনেলা সবসময়ই সংযমি। তার পর রেস্টুরেন্টের বাইরে এলো। এখন আর বৃষ্টি নেই। এমনিতেই শীতের শুরু তার উপরে বৃষ্টি, তাই প্রচুর কনকনে বাতাস। সোনেলা হালকা কাপছিলো।  শিশির দু কাপ কফি নেয়। দুজনেই গরম কফিতে চুমুক দিয়ে গরম আর ঠান্ডার ফিলিংস নিতে থাকে। কফি শেষ করে একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে হাসে। শিশির বলে, "শুনো তোমার হাসিতে আমি আবার পাগল হয়ে যাবো। এতো মুগ্ধতা মায়া কেনো গো তোমার হাসিতে।" 

সোনেলা লজ্জা পেয়ে আবার কৃত্তিম রাগের অভিনয় করে ধাক্কা দেয় শিশিরকে আর বলে, "চলো গাড়িতে উঠি। সময় শেষ"

------------------------------------------------------------


সকাল ৭ টার দিকে চট্টগ্রাম পৌঁছে গাড়ি। অলঙ্কার কাউন্টারে নেমে দুজনে সিএনজি নিয়ে চলে যায় টেকনিক্যাল মোড়ে। সেখান থেকে একটু দূরেই শিশিরের মামার বাসা। এই মামা অবশ্য শিশিরের বিয়ের কথা শুনার পর থেকেই পারিবারিক ভাবে দুজনকে এক করার চেষ্টা করছিলেন। তাই তার বাসায় যেতে শিশিরের সমস্যা নেই। আর আসবার আগেই শিশির আর সোনেলা জানিয়ে এসেছিলো এখানে। 


তারা কিছু মিষ্টি আর ফল কিনে নেয়। তার পরে শিশিরের মামার বাসায় পৌঁছালে সেখানে তারা খুব উষ্ণ ভাবে তাদেরকে স্বাগতম জানায়। এতো আপ্যায়ন দেখে সোনেলা আর শিশির দুজনেই লজ্জা পায়। 


যাই হোক, সারাদিন গল্প, টাইমলি খাওয়া দাওয়া আর এর মাঝে শিশিরের মামাতো বোন নীলার সাথে সোনেলার প্রচুর খাতির জন্মে যায়। সন্ধার দিকে সোনেলা শিশিরকে বলে, "চলোনা একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি। রাতের শহর টা দেখে আসি।" শিশির রাজি হয়। দুজনে মামা মামিকে বলে বাইরে বের হতে গেলেই নীলা এসে আবদার করে তাকে সাথে নেওয়ার। শিশির কিছু বলার আগেই সোনেলা বলে, "সমস্যা নেই, রেডি হয়ে এসো।" নীলা ১০ মিনিটের মাঝে রেডি হয়ে চলে।এলো। 

তিনজনে একটা সি এন জি নিয়ে চলে এলো দামপাড়া। সেখানে নেমে তারা ঝালমুড়ি খায়। সোনেলা আর নীলা যেনো মনে হচ্ছিলো দুই বান্ধবী। শিশির যে সাথে আছে তার কথা যেনো মনেই নেই। রাস্তায় পাশে থাকা হকারের কাছ থেকে সোনেলা এটা ওটা দেখে, এক গোছা লাল চুড়ি, নীল চুড়ি দেখে। তার পরে একটা পায়েল দেখে। হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখার পর সোনেলা কিছুই নেয়না, সব ফিরিয়ে দেয় দোকানীকে। শিশির সবই লক্ষ্য করে কিন্তু কিছুই বলেনা। ওদিকে নীলা এক গোছা চুড়ি নেয়, তার পর চুল বাধা ফিতা নেয়। নীলা বিল দিতে গেলেই সোনেলা বাধা দেয় বলে, আজ তোমার ভাইয়া আছে ভাইয়া দেবে- এই ভাইয়া বিল দাও। শিশির সোনেলার মাথায় গাট্টা মেরে বলে নীলাকে পেয়েই আমাকে ভাইয়া বলা হচ্ছে, বলে হেসে বিল দেয় দোকানীকে৷ তার পর সোনেলাকে বলে তুমি কিছু নিবেনা। সোনেলা বলে নাহ, লাগবেনা। 


তার পর তারা ফুচকার দোকানে বসে। সোনেলা আর নীলাকে ফুচকা দিতে বলে শিশির বলে আমি একটু আসছি, বলে চলে যায়। শিশির যেতেই সোনেলা ভাবে, "কোথায় গেলো ও,"  তার পর আবার মনে মনে ভাবে হয়তো চাপ বেড়েছে। 


তাদের খাওয়া হতে না হতে শিশির ফিরে আসে। তার পর নীলা আর সোনেলার হাতে দুটা প্যাকেট ধরিয়ে দেয়। শিশির নীলা কে বলে, "এই প্যাকেটে তোমার জন্য একটা জামা, আর মামার জন্য একটা পাঞ্জাবী আর মামির জন্য একটা শাড়ি আছে। কখনোতো আগে দেওয়া হয়নাই তাই আজ দিলাম।" নীলা এক গাদা সংকোচভরা গালে বলে, "ভাইয়া কি দরকার ছিলো এসবের।" সোনেলা নীলার পিঠ চাপড়ে দেয় আর বলে, "আরে সমস্যা নেই।" নীলা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। 

তার পর শিশির সোনেলা কে বলে, "তোমার জন্য ও একটি শাড়ি আছে, বাসায় যেয়ে দেখিও"


ঐ রাতে তারা বাসায় ফিরে আসার পরে ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার খেয়ে নেয়। শিশির আর সোনেলাকে নীলা তার রুমটাই ছেড়ে দিলো। সে যেয়ে তার স্টাডিরুমে, সাময়িক রেস্ট নেওয়ার সিঙ্গেল রুমে ঘুমিয়ে গেলো। এদিকে সোনেলা রুমে আসতেই দেখলো শিশির তাকে দেওয়া শাড়ির প্যাকটি হাতে ধরে বসে আছে। কাছে যেতেই শিশির বললো, "দেখি বিছানায় উঠে পা দুখানি এদিকে দাও গো একটু।" সোনেলা অবাক হয়ে বললো কেনো। শিশির বললো, এতো কথা বলো কেনো দাওনা গো প্লিজ। সোনেলা আর কথা না বাড়িয়ে পা দুখানি এগিয়ে দিলো। 

শিশির শাড়ির ব্যাগটি থেকে এক জোড়া পায়েল বের করে সোনেলার দু পায়ে পরিয়ে দিলো। তার পর এক গোছা নীল আর লাল চুড়ি বের করলো। তার পর দুই ভাগ করে এক সাথ করে সোনেলার দুই হাতে পরিয়ে দিলো। সোনেলা বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে গেছে। কারন সে সত্যিই এই চুড়ি আর পায়েল পছন্দ করেছিলো দোকানে। কিন্তু নীলা কিছু ভাববে ভেবে নেয়নাই। যদিও সামান্য দাম কিন্তু শিশির এই ছোট্ট ব্যাপারগুলাও খেয়াল করেছে তার। এটা ভেবে সে চুপ হয়ে মাথা নিচু করলো। 

শিশির তার থুতনি ধরে মাথাটা উচু করলো। দেখলো সোনেলার চোখে পানি। সোনেলার চোখে চোখ রেখে বললো শিশির, এই পাগলী শুনো। একটু দাঁড়াও তো এবার। সোনেলা উঠে দাঁড়ালো। শিশির সোনেলার পরনের শাড়িটি খুলে, আস্তে আস্তে সুন্দর করে নতুন কেনা শাড়িটি সোনেলাকে পরিয়ে দেয়। সুন্দর করে কুচি দিয়ে দেয় কোমরে। শাড়ি পরিয়ে সোনেলা কে বলে তুমি শুধুই আমার বেবি। আমি হাজার বছর তোমায় এমনে দেখতে পারি। বলেই সোনেলাকে জড়িয়ে ধরে। সোনেলার চোখে আবারও পানি এসে যায়। তার ছোট্ট বুকে এতো ভালোবাসা সইবে কিভাবে সে। এ পানি যে ভালোবাসার প্রকাশ। 


শিশির আবার সোনেলাকে বুকে মিশিয়ে ধরে জোরে, আর বলে তুমি যে আমার জীবনের সবটাই জুড়ে আছো। তোমার চোখের পানি যে আমার সহ্য হয়না।

এই কথাটা শিশির বিয়ের পর থেকে প্রতিদিনই বলে। আর সোনেলা তার জীবনে এই মুহূর্তে গুলাকে অত্যন্ত আবেগ ভরে অনুভব করে। দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে। ভালোবাসার নিবিড় পরশ দুজনের অন্তরকে একদম শীতল করে দেয়। 

তারা ঘুমিয়ে পড়ে এক অপার্থিব ভালোলাগা নিয়ে। 

--------------------------------------------------------------

হঠাৎ, শিশিরের ঘুম ভেঙে যায়। শিশির নিজেকে আবিস্কার করে সেই ব্যালকনিতে। যে ব্যালকনি থেকে গল্পের শুরু হয়েছিলো। শিশির বুঝে যায় সে স্বপ্ন দেখছিলো এতক্ষণ।  শিশিরের দুচোখ জুড়ে আসে অশ্রু। কারন সোনেলা আর কেউ নয়, সোনেলা হলো শিশিরের একান্ত ভালোবাসার মানুষ। সোনেলা যে শিশিরের আত্মার আত্নীয়৷ তাই তো শিশিরের সব গুলা সপ্নেই সোনেলাই থাকে। কারন সে তার সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে শুধু সোনেলাকেই ভালোবেসেছিলো। কিন্তু সোনেলা তো শিশিরকে চায়না। সে শিশিরকে ভালোবাসেনা। এসব ভাবতে ভাবতে আর তার দেখা সপ্নের কথা মনে করে দুচোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে যায়। আল্লাহর কাছে দু হাত উঠে প্রার্থনায় যেনো শিশির ফিরে পায় সোনেলাকে কোনো অবৈধভাবে নয় বরং সহধর্মিণী হিসেবেই।

লেখক পরিচিতি: Md. Abidur Rahman (AR Khan), B.S S (Economics), M.B.A (MIS- DU-IBA)

গল্পঃ মাতৃরুপি বোন (Short Story)

নিলিমা কে খেলার মাঠের দিকে আসতে দেখেই শুভ দ্রুত হেটে তার দিকে গেলো আর বললো, আপু তোকে না বলেছি, আমি যখন মাঠে খেলবো তুই আসবিনা। তোর এক চোখ নেই দেখতে খুব বিশ্রি লাগে। আমার বন্ধুদের সামনে আমার লজ্জা লাগে। 

নিলিমা মন খারাপ করে বাসায় ফিরে গেলো। আসলে ছোটো ভাইয়ের খেলা দেখতে তার ভালোই লাগে। কিন্তু তার ছোটো ভাই শুভ তাকে দেখলেই এমন বিহ্যাভ করে। 

নিলিমা ঘরে এসে কান্না করতে থাকে। তার মনে পড়ে যায় ১০ বছর আগের কথা। যখন শুভ মাত্র চার বছর বয়সের। একদিন খেলতে খেলতে শুভ'র বাম চোখে একটা কঞ্চির মাথা ঢুকে যায় আর তার চোখটি অন্ধ হয়ে যায়। সবাই সেদিন শুভকে নিয়ে হাসপাতালে। ডাক্তার বললেন চোখ ট্রান্সপ্লান্ট করা পসিবল। কিন্তু কে শুভ কে চোখ দিবে। সবাই শুভ'র কেবিনে শুভকে ঘিরে কান্না করছে। এমন সময় নিলিমা বললো মা, আমি চোখ দিবো। আমার ভাইকে আমি জীবনের চেয়েও ভালোবাসি। আমার এক চোখ দিয়ে হলেও আমার ভাইকে আমি সুন্দর দেখতে চাই। নিলিমা কোনো বুঝ ই শুনলোনা। শেষ পর্যন্ত নিলিমার এক চোখের বিনিময়ে শুভ ফিরে পেলো দুই চোখ ভরে পৃথিবী দেখার অধিকার। 

নিলিমার অনুরোধ রাখতে গিয়ে কেউই শুভ কে বলে নাই যে তার ছোটো বয়সে ওমন কিছু হয়েছিলো। তাই শুভ ভুলে গিয়েছে সব সময়ের সাথে সাথে। 

সেদিন শুভ বাসায় ফিরে এসে রাতে খাওয়ার টেবিলে মা'কে বলে, "মা তোমার মেয়ে যেনো যখন তখন আমার বন্ধুদের সামনে না যায়। আর খেলার মাঠে যখন আমি খেলি ও যেনো না যায়।"

মা বললেন কেনো?

শুভ বললো ও গেলে সবাই কেমন চোখে তাকায়। আর আমার লজ্জা লাগে। আর বলোতো মা ওর এক চোখ নেই এটা দেখলে তো আমারই বিশ্রি লাগে। ও সবার সামনে ওভাবে না যেয়ে ঘরে বসে থাকলেই তো পারে।

নিলিমার চোখে পানি আটকালোনা, তবুও বললো। আচ্ছা ভাই। যাবোনা। তুই খেলিস। আমার চোখ নাই, দেখতে বিশ্রি লাগে আমি জানি। তাই আসলে আমার যাওয়াটাই ভুল হয়েছিলো। চুপ করে খেয়ে নে ভাই। 

শুভ এরপরেও বলে, "শুন আপু আমার রুমেও রাত বিরাত আসবিনা। আর আসলেও বলে ঢুকবি। কারন হঠাৎ তোকে দেখলে আমার কেমন যেনো লাগে।"

নিলিমার চোখের পানি আরো বাড়লো, বললো ঠিক আছে ভাই। তোর ইচ্ছা মতই সব হবে। 

এতক্ষণ সব কথা শুনলেন তাদের মা বাবা। কিছুই বললেন না। খাওয়া শেষ করে, শুভকে ডাকলেন মা বাবা। তার পরে প্রথমে নিলিমার একটা ছবি দেখালেন। শুভ বললো হায় আল্লাহ, এটা নিলিমা। তাইলে তার আরেক চোখ কই গেলো এখন। তখন তো দেখছি দুটা চোখ ই আছে। এখন কেনো নেই।

উত্তরে মা কিছু বললেন না।। তিনি  আরেকটা ছবি দেখালেন তাতে দেখা যাচ্ছে, শুভ'র ছোট্ট বেলার একটা ছবি তাতে মা বাবা নিলিমা সবাই তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে হসপিটালের একটা বেডের পাশে। যেখানে শুধুমাত্র শুভ'র এক চোখ নেই। কিন্তু মা, বাবা, নিলিমা সবার চোখ ঠিক আছে। 

শুভ শিউরে উঠলো। বললো কিভাবে আমার এ অবস্থা হয়েছিলো। 

এবার মা কথা বললেন। কঞ্চির খোচায় এরকম হয়েছিলো। 

মা আরো একটি ছবি বের করলেন তাতে দেখা যাচ্ছে আগের মতোই সবাই শুভ'র বেডের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। শুভর কানা চোখে একটি নতুন চোখ লাগানো হয়েছে। কিন্তু এবারের ছবিতে নিলিমার এক চোখ নেই। 

শুভ ঘামতে লাগলো। সে মা কে বললো মা, আমার চোখ কিভাবে ফিরলো। আর নিলিমা আপুর চোখ কই গেলো। 

মা আর জবাব দিলেন না। মায়ের দু গাল বেয়ে পানি পড়তে লাগলো। শুভ তাকিয়ে দেখে বাবা ও কান্না করছেন। 

শুভ সব বুঝে গেলো এক নিমিষে। এক দৌড়ে সে নিলিমার ঘরে চলে গেলো। নিলিমা ঘুমিয়ে গিয়েছিলো। শুভ যেয়েই নিলিমাকে জড়িয়ে ধরলো, আর কান্না করতে লাগলো। শুভ'র ধাক্কায় নিলিমার ঘুম ভেঙে গেলো। সে উঠে বসে শুভকে বুকে টেনে নিলো আর বললো কি হইছ ভাই। এভাবে কান্না করছিস কেনো। কিছু দেখ ভয় পাইলি না-কি। 

শুভ বলল, না আপু। শুধু একটা জবাব দাও। কেনো তুমি আমাকে সুন্দর করতে গিয়ে নিজে অসুন্দর হয়ে গেলে। নিলিমার দুচোখে জল চলে এলো। সে কিছুই বলতে পারলোনা। সে শুভ'র চোখের পানি মুছে দিলো নিজের ওড়না দিয়ে, আর শুধু বললো তুই যে আমার কলিজার টুকরা ভাই৷ 

পরদিন থেকে দেখা গেলো। নিলিমার হাত ধরে শুভ খেলার মাঠের এক কোনে বসে আছে। আর দুজনে মিলে সকলের খেলা দেখছে। নিলিমা অনেক বুঝিয়েও শুভকে খেলতে পাঠাতে পারলোনা। কারন সে আজকে আর খেলার মাঝে নয় বরং তার আপুর হাসিতেই আনন্দ খুঁজে পেয়েছে। 

পৃথিবীর সকল বোনদের প্রতি লেখকের শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা। 

Wednesday, April 22, 2020

ভালোবাসার ডাকপিয়ন আর নীল শাড়ি পরা পরি

সেই দিন গুলোর মধ্যে একটি যেদিন BRTC দোতলা বাসে উঠে পছন্দসই জানালার পাশে বসার পরে নামে ঝুম বৃষ্টি। জানালার কাচ ইঞ্চি খানেক ফাকা করে ওখানে মাথা বাধিয়ে বৃষ্টির ছাট লাগাতে লাগাতে ভার্সিটির দিকে যাওয়া। সেদিন মনেই হয় যে যদি শহরটা জ্যাম বেধে স্তদ্ধ হয়ে যেতো অথবা সারাদিন বাস চলতে থাকতো। আর তার সাথে চলতো বৃষ্টি অঝোর ধারায়। 
যাই হোক এমন রোমান্টিক আবহাওয়ার মাঝেই, বেরসিক ভাবে বেজে উঠলো ফোনের ভাইব্রেটর। ফোন তুলেই দেখি আমার কাজিন নীলিমা। ও চাকরি করে হোটেল রাজমনি ঈসা খাঁ'এ রিসিপশনিষ্ট হিসেবে। আমি ওকে খুব পছন্দ ও করি, আমার থেকে বয়সে ১ বছরের বড় তার পরেও সম্পর্ক বন্ধুর মতো। 
যাই হোক ফোন ধরেই বললাম আপু তুমি, কি মনে করে ফোন দিলা, কেমন আছো। ও খুব উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বললো শিমু জানিস আমি একটা ছেলেকে বিয়ে করতে যাচ্ছি তুই আসতে পারবি বিকালে। আমার পুরো নাম শিমুল, আপু আমাকে আদর করে শিমু বলে। আমি কখনোই এত উচ্ছাস ওর কন্ঠে শুনিনি আগে। আমি, বললাম তুমি বলেছো যখন নিশ্চই আসবো। ও বললো আচ্ছা তুই বিকালে পেট্রোবাংলা অফিসের সামনে চলে আসিস। আমি ওখানেই থাকবো। আমি বুঝলাম যে নিশ্চই সাক্ষী দিতে হবে।
ফোন রেখে দিতেই,, আবার কল এলো। দেখি খালা ফোন দিয়েছেন, উনি হলেন নীলিমার মা। 
ফোন রিসিভ করে বললাম আন্টি আসসালামু আলাইকুম। উনি উত্তর দিয়েই বললেন, "খবর শুনেছিস, নীলিমা বিয়ে করতে যাচ্ছে একটা গাধাকে। গাধাটার নাকি যমুনা ফিউচার পার্কে একটা শো রুম আছে। জামা কাপড়ের। আর কোনো কিছুই নেই। চাকরি বাকরি করেনা, ওগুলোর ইচ্ছাও নেই, জগন্নাথ ইউনিভার্সিটি থেকে রসায়নে মাস্টার্স কমপ্লিট, অথচ কিছুই করেনা, এই লিখাপড়া দিয়ে কি হবে যদি চাকরিই না করে। আর ওর বাবাটাও একটা ভবঘুরে। তুই ই বল এমন ছেলের সাথে মেয়ের বিয়ে দেয়া যায়, বেকার চালচুল নেই৷ অকম্মার ঢেকি"
আমি বললাম "জি খালা, আমি তো শুনেছি, আমার এতে কিছুই করার নেই।"
উনি বললেন, "তোকে কিছু করতেই হবে, ওই অকম্মা ছেলেটাকে একটা উচিৎ শিক্ষা দিতে হবে, ওর ঠিকানা বের কর, আর আমার মেয়েটার সামনে তো কিছুই করা যাবেনা, আক্কাসকে নিয়ে যা, আর নীলিমার সাথে কথা বল, ছেলেটার ঠিকানা নীলিমার কাছ থেকে তুই ভুল ভাল বলে বের করবি, আক্কাসকে দিয়ে ওকে কি ভাবে ধরে জেলের ভাত খাওয়াতে হয় আমি জানি।"
আমি বুঝলাম যে আজ আর ভার্সিটি যাওয়া হবেনা। বাস কেবল নদ্দা থেকে উত্তর বাড্ডা পর্যন্ত গিয়েছিলো। ওখানেই নেমে গেলাম। নেমে খালার বাসা মগবাজারে যেয়ে আক্কাসকে সাথে নিলাম। আমার খালু বেচে নেই। খালু ইমতিয়াজ উদ্দিন সাহেব ছিলেন বড় ব্যাবসায়ী, ঢাকার সবাই তাকে প্রায় চিনে। খালার বাসার সব কাজ কর্ম আর খালার সাথে খালুর সেই সব ব্যাবসা এই আক্কাস দেখাশোনা করে। তবে আক্কাসকে শুধুমাত্র কাজের লোক বলা ভুল। ওর বেতন ১০ হাজার টাকা। ও মূলত সকল কাজের কাজী, বন্দুক, গাড়ি সব চালাতে পারে। ঢাকা শহরে সকল যায়গায় ওর হাত আছে। খালাকে ও বড় বোন বলে মেনে নিয়েছে।
যাই হোক আমি আক্কাসকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। নীলিমাকে ফোন দিয়ে বললাম আপু তুই তো আমাকে বিশ্বাস করিস তাইনা। 
ও বললো, "পাগল নাকি তুই, নিশ্চই কাকে বিয়ে করবো ওকে দেখার জন্য আমার আম্মু তোকে নিয়োগ করেছে?"
আমি বললাম, "হ্যা, তাই, এখন বল আমি আগে থেকেই ব্যবস্থা করি"
নীলিমা ঠিকানা বললো আমাকে। আমি টুকে নিলাম মোবাইল নোটে।
আক্কাস বললো "মামা চলেন যাই। কোথায় আছে হতচ্ছাড়া টা। এই দেখেন পকেটে কি নিয়ে আসছি, এটা ওর পকেটে সিস্টেম করে ঢুকিয়ে দিবো। দিয়ে থানায় কল দিয়ে পুলিশে দিবো।"
আমি জিনিসটা দেখে ওকে ফেরত দিলাম, বললাম এটা কি, ও বললো, আরে মামা এখনো চিনেন না, এ হলো ইয়াবা।
আমি বললাম আচ্ছা শোনো, তুমি মাঝে মাঝে রুপনগরে যাও, কেনো। 
ও একটু হতভম্ব হয়ে বললো, "আপনি কেমনে যানেন। মামা আপাকে বলিয়েন না, উনি রাগ করবেন, প্লিজ।" একেবারে অনুনয়ে গলে পড়লো।
আমি সবজান্তার হাসি হাসলাম। আমি মুলতঃ তিন্নি নামক একটা মেয়েকে পড়াতে যাই, রুপনগর বাজারের পাশে। তিন্নির বাবা এই এলাকার এক নম্বর মস্তান, যত প্রকার চাদাবাজি হোক সবই তিনি করেন। তবে আমার এখানে প্রচুর সম্মান, উনি তার মেয়ের টিচার হিসেবে আমাকে দেখলে যেখানেই হোক না কেনো উঠে দাড়িয়ে সালাম দেন। একদিন তিন্নি আমাকে বললো, "ভাইয়া দেখেন, ঐ লোকটি আমার বড় আপু তানিশার সাথে প্রায়দিন গল্প করে, আব্বুকে বলেছি, আব্বু ঐ লোকটাকে এমন শিক্ষা দেবে যে কয়েক জনম মনে থাকবে।"
আমি দেখি সেই লোকটি আক্কাস। 
আমি আক্কাসকে বললাম, ওর নাম তো তানিশা তাইনা, আক্কাস আমার হাত ধরে বললো মামা, প্লিজ পায়ে পড়ি, এ কথা আপনার খালা যেনো না জানে। 
আমি বললাম, ঐ মেয়েকি তোমাকে পছন্দ করে, তোমাদের সমস্যা কোথায়?"
আক্কাস বললো ওর বাবাই তো সমস্যা, উনি আমাকে দেখতেই পারেন না। অনেক বার ভেবেছি তোমার খালা তো আমার বড় বোনই হয় সম্পর্কে, উনার অনেক নাম ডাক আছে, আপার ছোট ভাই এ কথা বললে হয়তো রাজি হবে তানিশার বাবা। আমি আগের সব রংবাজি ছেড়ে দিয়েছি, আজকেই আপনার সাথে বের হলাম আপার কথায়। 

আমি বললাম, আচ্ছা চলো তাইলে একটা মিশনে যাই। খালার কাছে ফোন দিয়ে বললাম খালা কাজের জন্য ৫০ হাজার টাকা লাগবে লোক ম্যানেজ করতে। 
খালা বললো আচ্ছা, আক্কাসকে তুলে নিতে বল কার্ড দিয়ে, ওর কাছে কার্ড রাখা আছে আমার।
আমি আক্কাসকে বললাম আক্কাস মামা, ৬০০০০ টাকা তুলে নাও তো দেখি। 
আক্কাস আর কিছুই বলছেনা, তুলে নিয়ে আমার হাতে টাকা টা দিলো। আমি একটা উবার ভাড়া করে যমুনা ফিউচার পার্কে এলাম, নীলিমার বয়ফ্রেন্ড এর শো-রুমে, ওকে পরিচয় দিলাম এভাবে যে আমরা ওকে দেখতে আসছি, আমি নীলিমার সবচেয়ে কাছের ছোটো ভাই। 
দেখলাম একটা নিখাদ ভদ্র ছেলে। নাম সাজিদ, ওর বাবা মি. আশফাক আমিন, তিনি কোনো কাজ করেন না, শুধুমাত্র দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়ান, ভদ্রলোকের প্রচুর টাকা। আমি আগেই জানতাম  সাজিদও শিক্ষিত, কিন্তু ব্যাবসা করছে কেনো জিজ্ঞাসা করতেই বললো, ভাইয়া টাকার তো সমস্যা নেই।৷ আমার ব্যবসা ভালো লাগে কেনো চাকরি করবো। আমি দেখলাম আসলেই অনেক বড় শো-রুম অন্তত কয়েক কোটি টাকার মালামাল, কর্মচারী ২০/২২ জন। আক্কাস শুধু খুতখুত করছে, কখন কাজ শেষ করবে, আমি ওকে ইশারায় মানা করলাম।
আমি বিভিন্ন ভাবে কথা বলে এটা শিউর হলাম যে সে নীলিমাকে আসলেই অনেক পছন্দ করে।
 তার পর আমি খুব দামী একটা শাড়ি নিলাম ১৭ হাজার টাকা দিয়ে, আক্কাসের জন্য এক টা দামি প্যান্ট আর শার্ট কিনলাম৷ তার পরে বেরিয়ে এলাম।
আক্কাস বললো মামা কাজ তো হলোনা।
আমি বললাম দেখো কি হয়, বলে বেরিয়ে এসে, একটা উবার নিয়ে রুপনগরে এলাম তিন্নি দের বাড়ি। আক্কাসের চোখ বড় বড় হয়ে গেছে, তানিশা আমাদের দেখে আর সামনে আসছেনা। আমি তিন্নিকে বললাম তোমার বাবাকে ফোন দাও। 
ওর বাবা আসলো উনি এসে মাথা নিচু করে বসে থাকা আক্কাসকে দেখে রেগে গেলেন, বললেন এ এখানে কেনো। 
আমি বললাম, আংকেল ওর কথা বাদ দিন, পরে বলছি। আগে আপনি বলেন, ইমতিয়াজ সাহেব কে চিনতেন, রেবা গ্রুপের মালিক। 
তানিশার বাবা বললো, জি স্যার, উনাকে কে না চিনে। এতো বড় বিখ্যাত একটা মানুষ,  আহা হঠাৎ করেই মারা গিয়েছিলেন।
আমি বললাম, উনার এক মাত্র শ্যালক এর সাথে আপনার মেয়ে তানিশার বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে এসেছি। 
উনি বললেন সে তো খুব খুশির খবর, তা পাত্রের ছবি দেখান।
আমি বললাম,, এই হলো আমাদের পাত্র, আক্কাসকে দেখিয়ে বললাম। 
উনি চুপ চাপ কিছু বললেন না, তার পর উঠে দাড়ালেন, দেখি আক্কাস একদম ঘেমে লাল হয়ে গেছে। উনি উঠে দাড়িয়ে বললেন তানিশা এদিকে আয়তো।
তানিশা কাপতে কাপতে এসে বললো, বাবা বলো। ওর মাও এসে দাড়ালো পাশে।
আক্কাস কে দেখিয়ে বললেন, একে পছন্দ হয় তোর। 
তানিশা কিছু না বলে ওর মাকে জড়িয়ে ধরলো। 
আংকেল বললেন, মা, তানিশা তুই আমাকে কিছু না বলে লুকিয়ে ওর সাথে দেখা করিস, আমি এতে খুব কষ্ট পেয়েছি৷ তবে তোর স্যার প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন আমি সানন্দে গ্রহণ করলাম। 
আক্কাস কে বললাম, মামা তোমার কোনো আপত্তি আছে। 
আক্কাস কিছুই বলছেনা, ও হতভম্ব হয়ে গেছে।
আমি তানিশার জন্য আনা শাড়িটা তানিশার হাতে দিলাম দিয়ে বললাম এটা তোমার জন্য বিয়ের আগেই আমার পক্ষ থেকে উপহার। ওর চোখ দিয়েও পানি ঝরছে। আমি ওকে বললাম, আমাদের সাথে একটু যেতে পারবা। ও বললো হ্যা পারবো। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখি তানিশার পাশা পাশি তিন্নিও রেডি হয়ে এসে আমার হাত ধরে বললো ভাইয়া আমাকেও নিয়ে চলেন না সাথে। আমি হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম আচ্ছা চলো।

আমি আর সময় নিলাম না। বেরিয়ে এলাম, আংকেল বললো, স্যার যান। কালকেই আমরা যাবো আপনার খালার সাথে দেখা করতে।
আমি বাইরে এসে, তিনজনকে নিয়ে একটা উবারে উঠে কাওরান বাজার চলে এলাম, আসতে আসতে ৩ টা বেজে গেলো। ইতিমধ্যে নীলিমা একবার ফোন দিয়েছিলো আমার কাছে, আমি বললাম সব ঠিক আছে আসো৷ 
ওরা ৪ টার দিকে পেট্রোবাংলা অফিসের সামনে এলো। আমি, আক্কাস আর তানিশা ইতিমধ্যে চা নাস্তা করেছি। আক্কাস আমার হাত ধরে বলেছিলো মামা আপনি আমাদের জন্য যা করলেন, আসেন আমরা অন্তত খাওয়া দাওয়া করি।
আমি বললাম না, খাওয়া দাওয়া করবোনা এখন একবারে বিকালে করবো, একটা অনুষ্ঠান আছে তার পরে। আর তোমার জন্য যা করলাম তা এমনি এমনি করিনি। দেখি তুমি এর জন্য আমাকে কি দিতে পারো। 
নীলিমা আর সাজিদ আমাদের কে নিয়ে কাছাকাছি এক কাজি অফিসে নিয়ে গেলো। সাজিদ বললো ওর কিছু বন্ধু আছে যারা সাক্ষী দিবে, আর নীলিমা বললো শিমু তুই সাক্ষী দিবিনা, আমি বললাম নিশ্চই দিবো। তানিশা বললো ভাইয়া, আমি আর তিন্নি ও সাক্ষী হবো। তবে আমি একা একজন ছেলে, তানিশা আর তিন্নি দুজন যেহেতু মেয়ে তাই আরো একজন ছেলে লাগবে। আমি বললাম তাহলে সাজিদ ভাইয়ের বন্ধুরা আসুক। দেরি হয় হোক।
পাশের থেকে আক্কাস আমার হাত ধরে বললো, মামা আমি সাক্ষী দিবো৷ 
আমি বললাম সেকি আক্কাস তোমার না অন্য কাজ ছিলো। আক্কাস বললো,, থাক সে কাজ, আমি ওটা ফেলে দেবো বাইরে। 
বিয়ে হয়ে গেলো নীলিমা আর সাজিদের, সন্ধা হয়ে গেলো, সাজিদ আর নীলিমা প্রচুর টাকা নিয়ে এসেছিলো খরচ বাবদ। দেনমোহর ধরা হয়েছিলো মাত্র ২ লাখ টাকা। সাজিদ ১লাখ ৫০ হাজার টাকা দিলো নগদ, আমি নীলিমাকে বললাম আপু তুই কত এনেছিস বিয়ের খরচ বাবদ ও বললো ৬০ হাজার। 
আমি বললাম দাও আমাকে। 
ও কোনো কথা না বলে দিয়ে দিলো। আমি সাজিদের টাকার সাথে এই টাকার ৫০ হাজার যোগ করে ২ লাখ বানিয়ে নীলিমাকে দিয়ে বললাম এটা তোমার দেনমোহর পরিশোধ। 
আর বাকি টাকা আর সকালে তুলা খালার টাকা থেকে বিয়ের খরচ মিটিয়ে বাইরে বেরিয়ে সবাই মিলে খাওয়া দাওয়া করে নিলাম। আমি সাজিদকে বললাম, ভাইয়া তোমার বাবা কোথায়, তিনি কি রাজি হতেন না?
সাজিদ বললো উনি রাজি, এইযে উনি অলরেডি দুটা ভিসা পাঠিয়ে দিয়েছেন আমেরিকা যাওয়ার জন্য। নীলিমাকে নিয়ে। ওখানেই যাবো প্রথম হানিমুনে। 
আমি বললাম তাহলে, আজ তোমরা যার যার বাসায় যাও, নীলিমা আপু তোমার তো আজকে সাজিদ ভাইয়ের বাসা, হাসতে হাসতে বললাম। আর আক্কাস মামা তুমি তানিশা আর তিন্নিকে পৌছে দিয়ে আসো। আমি খালার সাথে দেখা করে আসি। কিছু তো বুঝাতে হবে। তিন্নি যাওয়ার সময় আবার আমার পাশে এসে আমার হাত ধরে বললো ভাইয়া, সাবধানে থাকবেন। আমি হাত ছাড়িয়ে বললাম, আচ্ছা ঠিক আছে।
আমি খালার বাসায় আসলেই খালা বললো আক্কাস কই, ওকে থানায় ভরা হয়েছে তো। 
আমি হতাশ সুরে বললাম, জি খালা কাজ তো হয়ে গেছে কিন্তু ওরা তো আরো ১ সপ্তাহ আগেই বিয়ে করেছে। তুমি ভুল ইনফরমেশন দিয়েছো।
আমার কথা শুনেই খালা হাত পা ছড়িয়ে কান্না শুরু করলেন, "এই জন্যই মেয়েটা আমার পাল্টে গেছে, আমার কি হবে, শেষ পর্যন্ত ঐ হতচ্ছাড়াটা আমার জামাই। আমি কখনোই মেনে নিবো না। "
হাফ ঘন্টা পরে আমি চলে যাচ্ছিলাম, খালা বললেন শিমুল, এক কাজ কর, আমি ওকে মেনে তো নিবোনা, কিন্তু বিয়ে যখন হয়ে গেছে, ওই ছেলেটাকে থানা থেকে বের করে আন, আমার মেয়েটা একা একা রয়েছে। আর হ্যা একটা কথা,  আমার বাড়ি, নীলিমা আর ওই বদমাশটার জন্য অফ এটাও বলে দিস। ছাড়ানোর জন্য যা লাগে আক্কাসকে তুলে নিতে বলিস।

আমি বললাম খালা, এই মেয়েটি কেমন লাগে তোমার কাছে (তানিশার ছবি দেখিয়ে বললাম), খালা বললেন তোর জন্য। আমি বললাম না খালা আক্কাস মামুর জন্য৷ বেচারি তো তোমার সেবাই করে সারাদিন। খালা ভালো করে দেখে বললেন এমন সুন্দর একটা মেয়ে আক্কাসকে বিয়ে করবে, ও তো হিসেবে আমাদের কাজ কর্ম দেখা শোনা করে।
আমি বললাম তুমি আক্কাসকে যে ভাই বলো, এটা হলেই তো হয়ে যায়৷ তোমার কথায় রাজি সবাই হবে। খালুর নাম ডাক অনেক ছিলো, তোমারও কম নয়। খালা বললেন এমন সুন্দর মেয়েটা আসতে চাইলে, আক্কাসকে আমি আমার কাজিন হিসেবেই ভাই বানিয়ে দিবো, আর আমি সত্যিই তো আক্কাসকে আমার ভাইয়ের মতোই জানি। আমার মেয়ে তো চলেই গেলো, এই মেয়েটাকে বাড়ি রাখবো। 
আমি খালাকে বললাম, ঠিক আছে, খালা তাহলে কালকে ওদের আসার ব্যবস্থা করতেছি। 
আমি আক্কাস, আর তানিশাকে ফোন দিলাম। ওদেরকে বুঝায়ে বললাম যে কাল তোমরা এসে যেনো নীলিমার বিয়ের খবর কাউকে দিয়োনা, তাইলে খালা খুব রাগ করবে, আর ষড়যন্ত্রকারী ভাবতেও পারে রাগের বশত। ওরা বললো শুধু আমরাই জানি। তানিশা বললো তিন্নিকেও নিষেধ করে দিচ্ছি।
পরদিন তানিশারাও এলো, সাথে ওর বাবা, মা, তিন্নি। খালা একদম বড় বোনের মতো আক্কাসের ব্যাপারে দায়িত্ব নিয়ে কথা পাকাপাকি করতে লাগলেন।
আমার কিছু ভালো লাগছিলো না। আমি, একটা রুমে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। কিছুক্ষণ পরে দেখি তিন্নি আমার রুমের দরজায় এসে বলছে ভাইয়া আসবো। 
হ্যা আসো৷ দেখলাম নীল শাড়ি পরে আসায় ওকে খুব সুন্দর লাগছে। এসে বললো, ভাইয়া কেমন লাগছে আমাকে?'
আমি বললাম বিউটিফুল মেয়ে। 
ও বললো, আপনি একবার বলেছিলেন শাড়ি পরা মেয়ে আমার ভালো লাগে।
আমি বললাম, ও আচ্ছা তাই বুঝি৷ তুমি কি কিছু বলবা এখন?
তিন্নি বললো না ভাইয়া, এমনিতেই এলাম।
আমি বললাম এক কাজ করো খুব ঘুম আসছে আমার, পরে কথা বলবো। 
বলে পাশ ফিরে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। কিছুক্ষণের মাঝে ঘুমিয়েও পড়লাম, কিন্তু যতক্ষণ জেগে ছিলাম, ওর যাওয়ার আভাস আমি পাইনি।
কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলাম বুঝিনি, তবে ঘুম ভাংলো তিন্নির ডাকে, ও আমার হাতে ধাক্কা দিচ্ছিলো আর বলছিলো, ভাইয়া ওঠেন, আপনার খালা ডাকছে নিচে। 
আমি উঠে চোখ কচলাতে কচলাতে নিচে এসে দাড়ালাম, তিন্নি আমার পেছন পেছন এসে পাশে দাড়ালো, আমি এগিয়ে যেয়ে খালার পাশের একমাত্র ফাকা যায়গাটায় বসে পড়লাম। ওদের বিয়ের ডেট ঠিক হয়ে গেলো।

এক সপ্তাহ পরে আক্কাসের বৌ হিসেবে তানিশা এই বাড়ি চলে এলো।
খালা তাকে বরণ করে নিলেন, আজ খুব কান্না করছেন খালা। তানিশা জিজ্ঞাসা করলো আমি আপনার ভাই বৌ, আপনার ছোট। আপনার কাছ থেকে ভালোবাসা চাই, কোনো অধিকার চাইনা। 
খালা বললেন, এমন বলোনা, আমার মেয়েটার কথা খুব মনে পড়ছে। 
তানিশা বললো, শিমুলকে বলেন ও কিছু করতে পারবে।
খালা বললেন কিভাবে বলি ওকে, আমি সাজিদকে জেলে পর্যন্ত পাঠিয়েছি। দেখি তাও শিমুলকে বলি।

খালা আমাকে ডেকে ১০০০০ টাকা হাতে দিয়ে বললেন, শিমুল নীলিমাকে খুব মনে পড়ছে। একটু ব্যাবস্থা কর। যাওয়ার সময় ওদের জন্য মিষ্টি নিয়ে যাস।
আমি আর কি করবো, নীলিমাকে নিয়ে আসলাম, সাজিদও এলো। ওরা এসেই খালাকে কদমবুসি করলো। খালা বললেন, "কি করে তোদেরকে ছেড়ে আমি থাকবো।" আক্কাস আর তানিশাও পাশে দাড়িয়ে আছে, ওদের চোখে ও পানি।
আমি বললাম, খালা আমরা স্যরি। খালা বললেন, কিসের জন্য।
আমি সব খুলে বললাম। খালা আমাকে বললেন থাক আর বলতে হবেনা, তুমি অনেক পেকে গেছো। তোমার ব্যাবস্থা নেয়া হবে।
আমি বললাম, এখন সব দোষই তো আমার, ওকে ঠিক আছে। 
নীলিমা আপু, আমাকে বললেন, শিমু তুই কাল তোর দুলাভাইয়ের দোকানে আসিস কালকে। তোকে এক সেট জামা কাপড় দিবো।
আমি বললাম, না তোমাদের জামা কাপড় নিয়ে আমি কি করবো। আমার আছে। 
আপু বললো, তুই না আসলে আর কখনোই আমাকে আপু বলে ডাকবিনা। 
আমি বললাম, "জো হুকুম মহারানী" বলে হেসে বেরিয়ে এলাম।

পরিশিষ্টঃ
আমার, বাসায় এসে ঢুকতে ঢুকতে ১১ টা বেজে গেলো। খালা অবশ্য থেকে আসতে বলেছিলো কিন্তু আমার নিজের বিছানা ছাড়া ভালো ঘুম হয়না। ১১ টা ৩০ এর দিকে আবার কল বেজে উঠলো, একটা অচেনা নাম্বার, রিসিভ করতেই ফোনের ওপাশের কন্ঠস্বরটি বললো, শিমুল তুমি কি আমাকে তোমার হাত দিয়ে ধরবে। আমি তোমার মুঠোর মধ্যে নিজের হাত দিতে চাই। তোমার বুকে মাথা রেখে তোমার মুখের উপর চুল গুলি ছড়িয়ে দিতে চাই। তোমার কোলে বসে তোমার বুকের ভেতরে ঢুকে যেতে চাই। আমাকে জড়িয়ে ধরে রাতের বেলা ঘুম পাড়িয়ে দেবে তুমি। অভিমান করবো তুমি আমার গাল টিপে দেবে। আমি মুখ ঘুরিয়ে নিবো, তুমি আমাকেই ঘুরিয়ে কোলে টেনে নেবে। আমার তপ্ত ঠোটে তুমি ঠোট রাখবে। আমি হারিয়ে যেতে চাই তোমার ভেতরে। কম্পমান আমার এই দেহটাকে তুমি শরীর দিয়ে আকড়ে ধরে রাখবে আর মন বেধে রেখো মনে। 

আমি বললাম, তুমি সত্যিই থাকবে তো।
ওপাশ থেকে বললো, "তুমি আমার চোখে তাকিয়ে দেখো এসে"
আমি বললাম, "আসবো দেখতে তোমার চোখ, তোমাকে আমি এখন থেকেই আমার মন পরি বানিয়ে নিলাম"
ও বললো কাল এসোনা বোটানিক্যাল গার্ডেনে, ন্যাশনাল জু এর পাশে। আমি থাকবো অপেক্ষায় তোমার। বলো কোন রং এর শাড়ি পরে আসবো।
আমি বললাম, নীল শাড়ি।
পরের দিন, হালকা আকাশী রং এর শার্ট আর জিনসের একটা প্যান্ট গায়ে চাপিয়ে, একটা পাঠাও বাইক নিয়ে চলে গেলাম বোটানিকাল গার্ডেনে। গেটের মুখ থেকে এক গুচ্ছ লাল গোলাপ কিনে নিলাম। ভেতরে ঢুকেই দেখি, আমার নিশী রাতের পরিটি বসে আছে একা এদিকেই চেয়ে। আমি কাছে যেতেই বললো কেমন আছেন আপনি। 
আমি বললাম, এখন আবার আপনি হলাম ক্যামনে। ওর হাতটি ধরে মুঠোর মাঝে নিলাম, ও উঠে দাড়ালো। আমরা হাটা শুরু করলাম।
ও বললো, ফুল গুলি কাকে দিবে তুমি।
আমি বললাম ফুল তো আমি হাতে নিয়েই ঘুরি, বলে ওর পেছনে গিয়ে গুচ্ছটা খুলে, চুলের খোপায় গুজে দিলাম একটা গোলাপ, ও আমাকে হ্যাচকা টান দিয়ে সামনে এনে ঠোটে একটা চুমু দিয়ে অস্ফুটে বললো, ভালোবাসি তোমাকে। 

[পাঠক পাঠিকারা নিশ্চই বুঝে গেছেন, শিমুলের নিশী রাতের পরিটি কে। লেখক তাদের জন্য শুভ কামনা করছেন, ভালো থাকুক তারা]

Writer: Md. Abidur Rahman, MBA form Institute of Business Administration (IBA), Dhaka University.