Showing posts with label wife. Show all posts
Showing posts with label wife. Show all posts

Thursday, February 29, 2024

যদি চায়ের কাপেতে জমে নিরবতা

ক্রিং ক্রিং ক্রিং ফোনটা বেজেই চলছে। মাহিন ফোনটি রিসিভ করতেই ওপার থেকে ইকবাল বলে মামা কোথায় তুই?

মাহিন: এইতো মামা স্কুল থেকে এলাম, কিছু কি বলবি। 
ইকবাল: রুদ্র দাঁ' র ছাদে আয় বিকালে আড্ডা দিবো, নসু মামা ও থাকবে। আবার মৃন্ময়ী রা আসছে। 
মাহিন: আচ্ছা দেখি কি করি।

রুদ্র'র ছাদে বিকালে আড্ডা জমে উঠেছে, মাহিন, ইকবাল রুদ্র দাঁ সবাই এসেছে। একটু পরে এসেছে মৃন্ময়ী আর তার বান্ধবী জোজো ও শৈপিল। মৃন্ময়ীকে দেখে মাহিন একটু হোচট খায়। কারন সে আগে স্কুল ড্রেসে তাকে দেখেছে কিন্তু এভাবে শাড়ি পরা কখনোই দেখেনাই। মাহিন মৃন্ময়ীর সামনে অনেকটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। 

শাহেদ স্যারের প্রাইভেট পড়ে বের হলেই ঝুম বৃষ্টি, মাহিন ছাতা নেয়নি সেদিন। কেউ কেউ বাসায় না গিয়ে বৃষ্টি কমার অপেক্ষায় প্রাইভেট শেষ হলেও রুমে অপেক্ষা করছিলো কেউ বা চলে গেছে। মাহিন বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিলো। এমন সময় কেউ এসে পাশে দাড়ালো। মাহিন পরিচিত সেন্ট পেয়ে মুখ ঘুরিয়েই দেখে মৃন্ময়ী। 
মাহিন তোতলায় আর বলে, কি খবর, কেমন আছো? মৃন্ময়ী হেসে বলে এই তো ভালো, এরকম তোতলাচ্ছো কেনো, আমি কি বাঘ না ভালুক। বলে হাসতে থাকে। মাহিনের বুকে আবারো অদৃশ্য ঝড়। কোমরে দুই হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লাস্যময়ী মৃন্ময়ীর দিকে তাকিয়ে থেকে ঝড়ের প্রাবল্য অনুভব করে মাহিন। 

মৃন্ময়ী বলে, তোমার ব্যাগে তো ছাতা আছে, আমাকে পৌঁছে দিয়ে আসোতো বাসায়, জরুরি কিছু কাজ আছে। মাহিন ঠিক আছে বলেই ছাতা বের করে মৃন্ময়ী কে নিয়ে রওনা হয়। কিন্তু মাহিন একটু দূরে দূরে হাটছিলো। হঠাৎ মৃন্ময়ী ওর হাত টেনে ধরে গায়ের সাথে মিশিয়ে দিয়ে বলে বৃষ্টিতে ভিজে যাবেতো। বলে গায়ে গা মিশিয়ে চলতে থাকে। মাহিনের তো বুকে হাতুড়ি পেটা হচ্ছে। বৃষ্টির জল তার গায়ে না পড়লেও মৃন্ময়ীর ছোঁয়ায় তার অন্তরে ঝড় বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সেই ঝড় তার বুক পর্যন্ত কাপিয়ে দিচ্ছে। শুধু মনে হচ্ছে এই বৃষ্টি যদি অনন্তকাল ধরে চলতো আর মৃন্ময়ীও তার পাশে এভাবে থাকতো চিরকাল। মৃন্ময়ীকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে ফিরে আসার সময় মৃন্ময়ী বলে "মাহিন তোমার ফোন নাম্বার টা দিয়ে যাও তো কখনো ইচ্ছে হলে কল দিতে হতে পারে"। মাহিন ফোন নাম্বার দিয়ে চলে আসে।

সেদিন রাতে, মাহিনের ফোনে হোয়াটসঅ্যাপে একটা মেসেজ আসে, " আমি মৃন্ময়ী" মাহিন তো খুবই অবাক, সে সাথে সাথে টেক্সট করে কেমন আছো? 
ওপাশ থেকে উত্তর আসে এইতো ভালো, তুমি কেমন?
মাহিন লিখে- ভালো আছি, এদিকে বুকে তার হাতুড়ি পেটা হচ্ছে। 
এভাবে চলতে থাকে টেক্সট। প্রতি রাতেই। অজস্র মেসেজে তাদের সময় কিভাবে মাঝরাত হয়ে যায়। তার পর ঘুমিয়ে যায় মাহিন।

এরমাঝে বন্ধু ইকবালের জন্মদিন। আয়োজন করা হয় ইয়োলো রেস্টুরেন্টে। মাহিন, মৃন্ময়ী, মৃন্ময়ীর দুই বান্ধবী জোজো আর শৈপিল, নসু মামা আর রুদ্র দাঁ সবাই আসে। কেক কাটা হয়। ইকবাল আর মৃন্ময়ী খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে একে অপরকে কেক খাইয়ে দেয়। এটা দেখে সবাই হাত তালি দেয় কিন্তু মাহিন হাত তালি দিলেও অনুভব করে তার বুকের ভেতর কেমন যেনো ফাকা ফাকা লাগতেছে। তাদের কেক পার্টি শেষ হলে ইয়োলো রেস্টুরেন্টের কার্ণিশে তারা ছবি তুলতে যায়। ছবি তুলার জন্যই এই কার্ণিশ টা করা হয়েছে।
এখানে উঠার সময় ইকবাল, নসু মামা, রুদ্র দাঁ সকলেই উঠে গেলেও মৃন্ময়ীদের উঠতে একটু কষ্ট হচ্ছিলো চিকন যায়গা দিয়ে। মাহিন হাত বাড়িয়ে হেল্প করতে গেলে জোজো হঠাৎ বলে উঠে মেয়ে দেখলেই সাহায্য করতে আসো আগ বাড়িয়ে। এগুলা আমরা বুঝি। সব ছেলেদেরই আমার চেনা আছে। এ কথা শুনে সকলেই হেসে উঠে।

নসু মামা হঠাৎ বলে মাহিন মেয়েদের একটু বেশিই হেল্প করতে চায়। সকলেই হাসে। 
এদিকে সব শুনেও মাহিন চুপ চাপ ই থাকে। সে ৪ তলার কার্ণিশে দাঁড়ানো মৃন্ময়ীর বাতাসে চুল উড়া দেখছে। সে মনে মনে ভেবে নেয় যে মৃন্ময়ীকে সে একদিন তার মনের কথা বলবে।

গ্রীষ্মের বন্ধ চলছে। সবাই বাসায় যার যার মতো পড়াশোনা আর ঘুরাঘুরি করে সময় কাটাচ্ছে। আবার একদিন ইকবাল তাদেরকে আড্ডা দেওয়ার জন্য ডাকে রুদ্র দাঁর বাসার ছাদে। সেদিন বিকালে মাহিন আসে, নসু মামা ও আসে, মৃন্ময়ীদের আসবার কথা থাকলেও তারা তখনও পৌঁছায়নি। নসু মামা বয়সে রুদ্র দাঁর চেয়ে বড় হলেও অনেক আড্ডা প্রিয় একজন মানুষ তাই সহজেই স্কুল পড়ুয়া ছেলেগুলোর সাথে মিশে থাকতে পারে। রুদ্র দাঁ তার সিগারেট ধরিয়ে একটু পরে মাহিনের হাতে দিলে মাহিন সেটা ইকবাল কে এগিয়ে দেয়। কারন সিগারেট খাওয়ার অভ্যেস তার নেই। এটা দেখে নসু মামা একটু জোক্স করে বলে আরে এক টান নিয়েই দেখো, একটু আধটু খেলে সবাই মরে যায়না। সবাই হেসে উঠে, মাহিন কোনোভাবেই নিতে চায়না কিন্তু সবার জোরাজুরিতে এক টান নিতেই সেখানে চলে আসে মৃন্ময়ীরা। এদিকে ওদের দেখে একটু অপ্রস্তুত হয়ে মাহিন কাশতে থাকে। মৃন্ময়ীরাও এসে সিগারেট ধরায় আর হাসাহাসি করতে থাকে।

সেদিন সন্ধ্যা নামলে মৃন্ময়ীরা চলে যায় আর ইকবাল ও মাহিন বাসার পথ ধরে। যেতে যেতে ইকবাল তাকে মৃন্ময়ীর অনেক গল্প শুনায়। মাহিন সব চুপচাপ শুনে আর ভাবে ইকবাল এতো কথা কিভাবে জানে। তাহলে কি ইকবালের সাথে মৃন্ময়ীর কোনো সম্পর্ক আছে? সে সাহস করে ইকবাল কে প্রশ্ন টা করতে পারেনা, কারন ইকবালের উত্তর যদি হ্যা হয় তাহলে সে কোনোভাবেই এটা মেনে নিতে পারবেনা। অবশ্য ইকবাল নিজে থেকেই বলে যে মৃন্ময়ীকে সে ভালোবাসে।

ইকবালের কাছ থেকে এমন কথা শুনার পরে মাহিন অনেকটাই হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়ে। কিন্তু ইকবালকে সে কিছুই বলেনা। কারন তার কাছে ভালোবাসার তুলনায় বন্ধুত্বটা অনেক বেশি কিছু ছিলো। সেদিন রাতে বাসায় ফিরে মাহিন চুপচাপ করে ভাবতে থাকে তার বিগত সময় গুলোর কথা। মৃন্ময়ীর মেসেজের রিপ্লাই ও দেয়না সেদিন মাহিন। 

মৃন্ময়ী সকাল থেকেই মাহিন কে কল দিচ্ছে কিন্তু মাহিন কল।রিসিভ করেনা। মাহিন টেবিলে বসে দেখছে একের পর এক কল গুলো বেজে বেজে শেষ হয়ে যাচ্ছে কিভাবে। 

কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ একটা আননোন নাম্বারের ফোন। মাহিন দ্রুত কল রিসিভ করলো কারন দারাজ থেকে তার একটা পার্সেল আসবার কথা। কিন্তু কল রিসিভ করতেই ওপার থেকে ভেসে এলো ঝাঝালো কন্ঠ মেয়েলী গলায়, "তোকে কত বার কল দিচ্ছি দেখস না, নাকি ইচ্ছে করেই কল ধরিস না, যে এখন কল দেওয়া মাত্র রিসিভ করলি?"
মাহিন স্তদ্ধ হয়ে গেলো, তার বুঝতে বাকি রইলোনা এটা মৃন্ময়ী। ওদিক থেকে মৃন্ময়ী কথা বলেই যাচ্ছে। মাহিনের কানে কথা যাচ্ছে বটে কিন্তু জবাব দেওয়ার মতো কিছু সে খুঁজে পাচ্ছেনা। মাহিন কে একেবারে চুপ থাকতে দেখে মৃন্ময়ী বললো, কিরে তুই কথা বলস না কেনো? 
এবার মাহিন বললো, "বলার অনেক কিছুই তো ছিলো, কিন্তু আর বলা হবেনা" বলেই কল কেটে দিলো।
মৃন্ময়ী হতভম্ব হয়ে গেলো, আর ভাবলো, তাহলে কি এদিকে অজান্তেই কেউ জ্বলে পুড়ে গেলো, কিন্তু সে আগে দেখেও বুঝলোনা।


অনেকদিন আর আড্ডায় যায়না মাহিন। স্কুল আর বাড়ি এভাবেই কাটছে সময়। কিছুদিন পরে, ইকবাল মাহিনকে ফোন দিলো।। ফোন দিয়ে বললো তোর সাথে কিছু কথা আছে রে আমার। সন্ধার পরে প্লিজ দেখা কর। মাহিন রাজি হলো। কিন্তু এক বুক হতাশা তার ভেতর। ইকবাল কি বলবে সেটা নিয়েই সে দুশ্চিন্তায় আছে।

সন্ধার পরে চায়ের দোকান থেকে দুই কাপ চা নিয়ে একটু দূরে দাঁড়িয়ে মাহিন ইকবালকে জিজ্ঞাসা করলো, বল কি বলবি। 
ইকবাল, "তুই কি জানিস মৃন্ময়ীর সাথে আমার সম্পর্ক চলছে?"
মাহিন, "হ্যা জানি তো, কেনো কি হয়েছে?"
ইকবাল, "মৃন্ময়ীর সাথে আমি আর সম্পর্ক রাখতে চাইনা, ও আমাকে বুঝেইনা, সম্পর্কের গভীরতাই বুঝেনা ও"
মাহিনের মনে মনে কেনো জানি বসন্তের হাওয়া বইতে লাগলো, তবুও মুখের ভাব রেখেই জিজ্ঞাসা করলো, "কি জন্য, সেটা তো বল, দেখি তোকে হেল্প করা যায় কিনা"
ইকবাল, "না-রে তেমন কিছু নয়। একটা রিলেশনে বর্তমান যুগে কিছু পার্সোনাল সময়ের প্রয়োজন আছে। যেহেতু ভালোবাসি তাই কিছুটা একান্ত সময় তো চাইতেই পারি, কিন্তু ও একেবারেই চুপ চাপ কিছুতেই আমাকে সুযোগ দেয়না। অথচ তার নাকি তার কাজিনের সাথে শারিরীক সম্পর্ক ও ছিলো" 
মাহিন কেমন যেনো চুপসে গেলো, তবুও বললো, "মামা কথা বলে দেখি, কি করা যায়।"
ইকবাল, "তুই আমার পক্ষ নিয়ে আর কথা বলতে যাসনা, তুই কথা বলবি বল। আমি ব্রেক আপ করে নিয়েছি"


মাহিন আগের মতোই আড্ডায় যায়না। সপ্তাহ খানেক পর আবার মৃন্ময়ীর ফোন, 
ফোন টা দেখতেই মাহিন রিসিভ করলো, "হেলো"
ওদিক থেকে কন্ঠস্বরে আকুলতা, "দেখা করবে একটু সন্ধার পরে সাগুফতায়"
মাহিন না বলতে যেয়েও পারলোনা, বললো, "ঠিক আছে আসবো আমি"

সন্ধার পরে সাগুফতায় দুজনে আসলো, মৃন্ময়ী কেমন যেনো শুকিয়ে গেছে, নীল একটা শাড়ি পরে এসেছে দেখা করতে। মাহিন তাকে দেখে যেনো চোখ ফেরাতে পারছিলোনা। জিজ্ঞাসা করলো, কেমন আছো মেঘা। 
মৃন্ময়ী অবাক হয়ে বললো, মেঘা মানে, আমি তো মৃন্ময়ী।।
মাহিন বললো, কোনো এক বাদল দিনে এক মেঘবালিকার সাথে হেটেছিলাম বৃষ্টিস্নাত রাস্তায়। তার ছিলো মেঘ কালো চুল, সেদিন ই মনে হয়েছিলো এই মেঘবালিকাটাকে চিরকাল পাশে নিয়ে চলতে চাই জীবনের শেষ পর্যন্ত।
মৃন্ময়ী কথা বলছেনা, চুপ করে আছে। 
মাহিন আবারো বললো, সে কি চুপ করেই থাকবে না-কি আমার সাথে। 
মৃন্ময়ী বললো, "তুমি কি বলতে চাইছো আমি জানি, কিন্তু তোমার বন্ধু ইকবাল বলেছেতো তোমাকে যে আমি ভালো মেয়ে নই, শুধু তোমাকেই না সে সকলকেই বলেছে এমন কথা"
মাহিন বললো, আমি কি বলেছি তোমায় এসব?
মৃন্ময়ী বললো, না- কিন্তু কেনো তুমি বলছোনা
মাহিন বললো, আমি তোমার অতীত নিয়ে কি করবো, আল্লাহ চাইলে ক্ষমা করে দিবেন। তুমি যদি ভুল করেও থাকো, তবুও এখন তো করছোনা
মৃন্ময়ী বললো, একটা সত্যি কথা বলি তোমাকে, যেহেতু তুমি বিশ্বাস করেছো আমায়। আমার আসলে এমন কোনো ঘটনাই নেই। বরং তোমার বন্ধু আমাকে তার সাথে একান্ত সময় কাটাতে বলছিলো তাই আমি তাকে বাঁধা দেওয়ার জন্যই এমন টা বলেছিলাম। 
মাহিন বললো, তাহলে তো আলহামদুলিল্লাহ।
মৃন্ময়ী বললো, "কি চলে যাবে না-কি?"
মাহিন বললো, "হ্যা যাবোই তো, কিন্তু আজ যে শুনতে চাই আমার বুকে একটা পাখিকে আটকাতে চাই, কিন্তু সেই খাচার তো দরজা নেই। পাখি কি থাকবে আজীবন, নাকি বেরিয়ে যাবে। "
মৃন্ময়ী চুপ হয়ে থাকলো। কিছুই বলছেনা। মাথা নিচু করে আছে
মাহিন তার দিকে তাকিয়ে দেখে মৃন্ময়ীর চোখে পানি, কিছুই বলছেনা। মাহিন তার হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে দিলো আর বললো, "চলোনা আমার মেঘবালিকা তোমায় নিয়ে হাটি চিরকাল। তোমায় পরম যত্নে বুকে ধারণ করে রাখবো চিরকাল, কখনো ছেড়ে যাবেনা তো আমায়"
মৃন্ময়ী মাহিনের হাত ধরলো আর বললো, চলো যাই।।

তার পর কেটে গেলো জীবনের ১২ টি বসন্ত। ইকবাল মালয়েশিয়া থেকে এসে মাহিনের বাসায় বেড়াতে এসেছে। মাহিন এখন সরকারী চাকরি করে। মাহিনের বাসায় মৃন্ময়ীকে দেখে তো সে অবাক।
খাওয়া দাওয়া শেষে এক সময় ফাঁকা পেয়ে ইকবাল মাহিনকে বললো, "কিরে মাহিন তোকে সব বললাম ওর চরিত্র সম্পর্কে, তবুও কেমনে কি এটা করলি"
মাহিন বললো, "সবাই তো জিততে চায়, আমি না হয় মৃন্ময়ীকে নিয়ে ঠকেই গিয়েছি" মৃন্ময়ী সেই সময় রুমে ঢুকেই সব শুনতে পেলো। ইকবাল কথা না বাড়িয়ে চলে গেলো।

সেদিন রাতে ছাদে চন্দ্রালোকিত চারিদিক।। একটা দোলনাই মাহিন আর মৃন্ময়ী দুই কাপ চায়ে ঠোট লাগিয়ে করছে রাত্রি বিলাস। নীল শাড়ি চাঁদের আলোয় আরো কালো হয়ে ফুটে উঠছে মৃন্ময়ীর শরীরে। তাকে করে তুলেছে অপার্থিব অপরুপা।। চারিদিকে শুনশান, যেনো চায়ের কাপেও জমেছে অজস্র নিরবতা। মাহিন তাকিয়ে আছে মৃন্ময়ীর দিকে, সেই মুগ্ধতা, যা এক যুগ পরেও পরিবর্তন হয়নাই, তৃপ্তি মেটেনাই।
হঠাৎ নিরবতা ভেঙে মৃন্ময়ী প্রশ্ন করলো, "আমাকে নিয়ে তাইলে ঠকেই গেছো তাইনা"
মাহিন চায়ের কাপ নামিয়ে রাখলো দোলনার পাশে, আর বললো, "ঠকেই তো গিয়েছি, মানুষ বার বার নতুনের মায়ায় পড়ে, কত বৈচিত্র‍্য আনে জীবনে। আর আমি, দেখো এক মেঘবালিকার মায়ায় পড়ে প্রতিদিন নতুন নতুন করে তারই মায়াই পড়ি"
মৃন্ময়ী মাহিনের ঠোটে হাত দিয়ে বললো, থামো এত বলতে নেই। আমার ভয় হয় যদি সময় শেষ হয়ে যায়।
মাহিন মুচকি তাকে বুকে টেনে নেয়, দুজনেই ঘুমিয়ে যায় দোলনায়। সৃষ্টিকর্তার অপার রহমত ঝরে পড়ে তাদের উপর। লেখকের শত সহস্র শুভকামনা তাদের জন্য। 

Writer: Md. Abidur Rahman, DU-IBA, based on a story of Mahbub Alam

Thursday, November 24, 2022

যে স্বপ্ন দেখা কখনোই শেষ হয়না

রাত বাজে ৩ টা,, ৬ তলায় থাকা একটি ব্যালকনি থেকে কেউ একজন রাতের আকাশ দেখছে। পাশের বাসার বিড়াল টি মাঝে মাঝে মিউ মিউ করছে সম্ভবত ব্যালকনিতে কাউকে দেখেই করছে। সামনের বাসার ছাদে ফুটে থাকা হাস্নাহেনা ফুলের সেন্ট আসছে। চাঁদের আলোয় আলোকিত চারিদিক। মায়াময় লাগছে সবকিছু।  ছেলেটি আনমনে সব যেনো দেখছে। যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই রাতের নিরবতা পূর্ণ সৌন্দর্যের প্রেমে মজেছেন কবি সাহিত্যিক রা।  কোনো দিকে খেয়াল নেই। হঠাৎ নিস্তব্ধতা ভেঙে ঘেউ ঘেউ করে উঠলো দূরের দুটি কুকুর। 


এমন সময়-- "শিশির, ঐ শিশির! তুমি কই?" রুমের ভেতর থেকে ডাক দিয়ে বললো একটি মেয়ে। 

ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটি জবাব দিলো এইতো ব্যালকনিতে। 

ভেতর থেকে আর জবাব এলোনা। কিছুক্ষণ পরে একটি মেয়েলী ছায়া রুমের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে প্রশ্ন করলো, এই এতো রাতে এখানে কেনো। শরীর খারাপ করবে, ভেতরে চলো। বলে জবাবের অপেক্ষা না করেই একরকম টানতে টানতে ছেলেটিকে ভেতরে টেনে নিয়ে গেলো। 

এতক্ষণ যাদের কথা বলছিলাম, তারা হলো সোনেলা আর শিশির। দুজনে বিয়ে করেছে সম্প্রতি। একই সাথে পড়তো দুজনেই। চোখাচোখি, বন্ধুত্ব, ভালোলাগা,,লুকোচুরি,, প্রণয় তার পর বিবাহ। ফলস্বরূপ দুই পরিবারের কেউই পুরোপুরি মেনে নেয়নি। তবে পরিস্থিতি বুঝাচ্ছে যে মেনে নিবে একসময়। তাদের সংসার খারাপ চলছেনা। শিশির জব করে, তাতে যা স্যালারি আসে, তাতে ভালোভাবেই চলে যায় দিন। বাসাভাড়া, খাওয়া দাওয়া সব মিলিয়ে ২০ হাজার টাকার মতো লাগে দুজনের সারা মাসে। 


হাতে সামান্যই থাকে তবুও শিশির একে একে সোনেলার পছন্দ গুলা পুরণ করার চেষ্টা করে। সোনেলা কিছুই চায়না প্রয়োজনের বাইরে।  অফিস থেকে আসার পরেই ফ্রেশ হয়ে শিশির সোনেলাকে বলে চলো একটু হেটে আসি। সোনেলাও ঝটপট রেডি হয়ে নেয়। বাসা থেকে বের হয়ে সোনেলাকে ফুচকা খাওয়ায় কোনোদিন, আবার কোনোদিন বা আইসক্রিম। অথচ শিশির কিছুই খায়না শুধু চা ছাড়া। কারন তার ওগুলা ভালো লাগেনা। মাঝে মাঝে সোনেলা জোর করে খাইয়ে দেয় কিছু। তার পর দুজনে দুজনের হাত মুঠি করে ধরে বাসায় ফিরে আসে৷


শিশির দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে পা ছড়িয়ে, সোনেলা এসে বিছানার অপর প্রান্তে বসে৷ শিশির কিছুক্ষণ পরে সোনেলাকে বলে, এই এদিকে এসো একটু কাজ আছে। সোনেলা মৃদু হেসে তার দিকে এগিয়ে যায়। কারন সে জানে শিশির কি করবে, এটা তার নিত্য দিনের অভ্যেস। 


কাছে গেলেই শিশির সোনেলাকে টেনে শুইয়ে দিবে কোলের উপর। তার পর মাথার চুল গুলা খুলে দিবে। আস্তে আস্তে চুলে বিলি কাটবে আর গল্প করবে। আর একে একে প্রশংসা করবে সোনেলার চোখের। টুপ করে মুখ নিচু করে দু চোখে চুমু খাবে আর বলবে, তোমার চোখেই যে আমার মরন হয়ে যাবে গো ঘুমবেবি। সোনেলাকে অনেক আদুরে নামে ডাকে শিশির। 

সোনেলা কৃত্তিম রাগ দেখিয়ে, মুখ ঘুরিয়ে বলবে- ধ্যাত, খালি আদিখ্যেতা, ভাল্লাগেনা। 

শিশির আবার তাকে জাপটে ধরবে। মুখ ফিরায় নিবে তার পর সারা মুখে চুমু দিয়ে ভরে দিবে। আস্তে আস্তে সোনেলার মিথ্যা রাগ ভাঙ্গাবে। 


এক বছর কেটে যায়। নভেম্বর মাস। বাচ্চা কনসিভ করেছে সোনেলা। শিশির খুব খুশি। সোনেলাকে বলে মাত্র বাচ্চা কনসিভ হয়েছে, সময় থাকতে চলোনা পাগলী ঘুরে আসি চট্টগ্রাম। সোনেলা খুব খুশি হয়ে যায়।

১১ই নভেম্বর, শিশির সেদিন রাতের টিকিট কাটে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে। রাত ১০:৪৫ এ গাড়ি। আরামবাগ কাউন্টার থেকে, Soudia Mercedes-Benz এ। সোনেলার আনন্দ যেনো আর ধরেনা। কারন সে এর আগে সাগর আর পাহাড় ছবিতেই দেখেছে শুধুমাত্র। আর সোনেলার আনন্দ দেখে শিশিরের মন পাগল হয়ে যাচ্ছে। রাত ৮:৩০ এ বাসা থেকে বের হয়ে দুজনে উবার নিয়ে চলে গেলো বাস কাউন্টারে। 


শিশির দু প্যাকেট চিপস কিনলো, সাথে কোকাকোলা। গাড়িতে উঠার সাথে সাথেই শুরু হলো বৃষ্টি। সৌদিয়া বাস তার ক্ল্যাসিকাল স্পিডে চলা শুরু করলো। সোনেলা প্রচন্ড ভাবে ফিল করছিলো তার সময় গুলা। শিশিরের গায়ে মাথা রেখে বললো- "আচ্ছা শিশির আমি তোমার কে হই।"

 শিশির তার মাথা তুলে দিলো। তার পর সোনেলার মুখ খানি নিজের দিকে ফিরিয়ে চোখে চোখ রেখে বললো, "তুমি আমার অক্সিজেন। আমার সবটুকুই তুমি। তুমি শুধু আমার কলিজার টুকরাই নও বরং পুরো কলিজাটাই তুমি।" 

সোনেলার দুচোখে পানি, শিশির তার হাত দিয়ে পানি গুলা মুছে এনে নিজের মুখে মাখিয়ে নিলো। বললো, "এই পাগলী! কান্না করোনা, তোমার কান্না আমার সয়না লক্ষীটি, আমার বুক ভেঙে যায়, প্লিজ একটু হাসো।" ফিক করে হেসে দিলো সোনেলা। শিশির ও সোনেলাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরলো। রাতের বৃষ্টি ভেজা পথ দিয়ে সাই সাই করে গাড়ি ছুটে চলছে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে। 


রাত প্রায় ৪ টার দিকে চৌদ্দগ্রাম টাইমস্কয়ার হাইওয়ে রেস্টুরেন্টে গাড়ি থামলো ২০ মিনিটের জন্য। সোনেলা আর শিশির ও নামলো। সোনেলার হাত ধরে শিশির লেডিস ওয়াশরুমের সামনে এলো। সোনেলা ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এলো। দুজনে মিলে হালকা কিছু নাস্তা করলো। যদিও বুফে ফ্রি ছিলো টিকিটের সাথেই। কিন্তু শিশির আর সোনেলা সবসময়ই সংযমি। তার পর রেস্টুরেন্টের বাইরে এলো। এখন আর বৃষ্টি নেই। এমনিতেই শীতের শুরু তার উপরে বৃষ্টি, তাই প্রচুর কনকনে বাতাস। সোনেলা হালকা কাপছিলো।  শিশির দু কাপ কফি নেয়। দুজনেই গরম কফিতে চুমুক দিয়ে গরম আর ঠান্ডার ফিলিংস নিতে থাকে। কফি শেষ করে একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে হাসে। শিশির বলে, "শুনো তোমার হাসিতে আমি আবার পাগল হয়ে যাবো। এতো মুগ্ধতা মায়া কেনো গো তোমার হাসিতে।" 

সোনেলা লজ্জা পেয়ে আবার কৃত্তিম রাগের অভিনয় করে ধাক্কা দেয় শিশিরকে আর বলে, "চলো গাড়িতে উঠি। সময় শেষ"

------------------------------------------------------------


সকাল ৭ টার দিকে চট্টগ্রাম পৌঁছে গাড়ি। অলঙ্কার কাউন্টারে নেমে দুজনে সিএনজি নিয়ে চলে যায় টেকনিক্যাল মোড়ে। সেখান থেকে একটু দূরেই শিশিরের মামার বাসা। এই মামা অবশ্য শিশিরের বিয়ের কথা শুনার পর থেকেই পারিবারিক ভাবে দুজনকে এক করার চেষ্টা করছিলেন। তাই তার বাসায় যেতে শিশিরের সমস্যা নেই। আর আসবার আগেই শিশির আর সোনেলা জানিয়ে এসেছিলো এখানে। 


তারা কিছু মিষ্টি আর ফল কিনে নেয়। তার পরে শিশিরের মামার বাসায় পৌঁছালে সেখানে তারা খুব উষ্ণ ভাবে তাদেরকে স্বাগতম জানায়। এতো আপ্যায়ন দেখে সোনেলা আর শিশির দুজনেই লজ্জা পায়। 


যাই হোক, সারাদিন গল্প, টাইমলি খাওয়া দাওয়া আর এর মাঝে শিশিরের মামাতো বোন নীলার সাথে সোনেলার প্রচুর খাতির জন্মে যায়। সন্ধার দিকে সোনেলা শিশিরকে বলে, "চলোনা একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি। রাতের শহর টা দেখে আসি।" শিশির রাজি হয়। দুজনে মামা মামিকে বলে বাইরে বের হতে গেলেই নীলা এসে আবদার করে তাকে সাথে নেওয়ার। শিশির কিছু বলার আগেই সোনেলা বলে, "সমস্যা নেই, রেডি হয়ে এসো।" নীলা ১০ মিনিটের মাঝে রেডি হয়ে চলে।এলো। 

তিনজনে একটা সি এন জি নিয়ে চলে এলো দামপাড়া। সেখানে নেমে তারা ঝালমুড়ি খায়। সোনেলা আর নীলা যেনো মনে হচ্ছিলো দুই বান্ধবী। শিশির যে সাথে আছে তার কথা যেনো মনেই নেই। রাস্তায় পাশে থাকা হকারের কাছ থেকে সোনেলা এটা ওটা দেখে, এক গোছা লাল চুড়ি, নীল চুড়ি দেখে। তার পরে একটা পায়েল দেখে। হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখার পর সোনেলা কিছুই নেয়না, সব ফিরিয়ে দেয় দোকানীকে। শিশির সবই লক্ষ্য করে কিন্তু কিছুই বলেনা। ওদিকে নীলা এক গোছা চুড়ি নেয়, তার পর চুল বাধা ফিতা নেয়। নীলা বিল দিতে গেলেই সোনেলা বাধা দেয় বলে, আজ তোমার ভাইয়া আছে ভাইয়া দেবে- এই ভাইয়া বিল দাও। শিশির সোনেলার মাথায় গাট্টা মেরে বলে নীলাকে পেয়েই আমাকে ভাইয়া বলা হচ্ছে, বলে হেসে বিল দেয় দোকানীকে৷ তার পর সোনেলাকে বলে তুমি কিছু নিবেনা। সোনেলা বলে নাহ, লাগবেনা। 


তার পর তারা ফুচকার দোকানে বসে। সোনেলা আর নীলাকে ফুচকা দিতে বলে শিশির বলে আমি একটু আসছি, বলে চলে যায়। শিশির যেতেই সোনেলা ভাবে, "কোথায় গেলো ও,"  তার পর আবার মনে মনে ভাবে হয়তো চাপ বেড়েছে। 


তাদের খাওয়া হতে না হতে শিশির ফিরে আসে। তার পর নীলা আর সোনেলার হাতে দুটা প্যাকেট ধরিয়ে দেয়। শিশির নীলা কে বলে, "এই প্যাকেটে তোমার জন্য একটা জামা, আর মামার জন্য একটা পাঞ্জাবী আর মামির জন্য একটা শাড়ি আছে। কখনোতো আগে দেওয়া হয়নাই তাই আজ দিলাম।" নীলা এক গাদা সংকোচভরা গালে বলে, "ভাইয়া কি দরকার ছিলো এসবের।" সোনেলা নীলার পিঠ চাপড়ে দেয় আর বলে, "আরে সমস্যা নেই।" নীলা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। 

তার পর শিশির সোনেলা কে বলে, "তোমার জন্য ও একটি শাড়ি আছে, বাসায় যেয়ে দেখিও"


ঐ রাতে তারা বাসায় ফিরে আসার পরে ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার খেয়ে নেয়। শিশির আর সোনেলাকে নীলা তার রুমটাই ছেড়ে দিলো। সে যেয়ে তার স্টাডিরুমে, সাময়িক রেস্ট নেওয়ার সিঙ্গেল রুমে ঘুমিয়ে গেলো। এদিকে সোনেলা রুমে আসতেই দেখলো শিশির তাকে দেওয়া শাড়ির প্যাকটি হাতে ধরে বসে আছে। কাছে যেতেই শিশির বললো, "দেখি বিছানায় উঠে পা দুখানি এদিকে দাও গো একটু।" সোনেলা অবাক হয়ে বললো কেনো। শিশির বললো, এতো কথা বলো কেনো দাওনা গো প্লিজ। সোনেলা আর কথা না বাড়িয়ে পা দুখানি এগিয়ে দিলো। 

শিশির শাড়ির ব্যাগটি থেকে এক জোড়া পায়েল বের করে সোনেলার দু পায়ে পরিয়ে দিলো। তার পর এক গোছা নীল আর লাল চুড়ি বের করলো। তার পর দুই ভাগ করে এক সাথ করে সোনেলার দুই হাতে পরিয়ে দিলো। সোনেলা বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে গেছে। কারন সে সত্যিই এই চুড়ি আর পায়েল পছন্দ করেছিলো দোকানে। কিন্তু নীলা কিছু ভাববে ভেবে নেয়নাই। যদিও সামান্য দাম কিন্তু শিশির এই ছোট্ট ব্যাপারগুলাও খেয়াল করেছে তার। এটা ভেবে সে চুপ হয়ে মাথা নিচু করলো। 

শিশির তার থুতনি ধরে মাথাটা উচু করলো। দেখলো সোনেলার চোখে পানি। সোনেলার চোখে চোখ রেখে বললো শিশির, এই পাগলী শুনো। একটু দাঁড়াও তো এবার। সোনেলা উঠে দাঁড়ালো। শিশির সোনেলার পরনের শাড়িটি খুলে, আস্তে আস্তে সুন্দর করে নতুন কেনা শাড়িটি সোনেলাকে পরিয়ে দেয়। সুন্দর করে কুচি দিয়ে দেয় কোমরে। শাড়ি পরিয়ে সোনেলা কে বলে তুমি শুধুই আমার বেবি। আমি হাজার বছর তোমায় এমনে দেখতে পারি। বলেই সোনেলাকে জড়িয়ে ধরে। সোনেলার চোখে আবারও পানি এসে যায়। তার ছোট্ট বুকে এতো ভালোবাসা সইবে কিভাবে সে। এ পানি যে ভালোবাসার প্রকাশ। 


শিশির আবার সোনেলাকে বুকে মিশিয়ে ধরে জোরে, আর বলে তুমি যে আমার জীবনের সবটাই জুড়ে আছো। তোমার চোখের পানি যে আমার সহ্য হয়না।

এই কথাটা শিশির বিয়ের পর থেকে প্রতিদিনই বলে। আর সোনেলা তার জীবনে এই মুহূর্তে গুলাকে অত্যন্ত আবেগ ভরে অনুভব করে। দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে। ভালোবাসার নিবিড় পরশ দুজনের অন্তরকে একদম শীতল করে দেয়। 

তারা ঘুমিয়ে পড়ে এক অপার্থিব ভালোলাগা নিয়ে। 

--------------------------------------------------------------

হঠাৎ, শিশিরের ঘুম ভেঙে যায়। শিশির নিজেকে আবিস্কার করে সেই ব্যালকনিতে। যে ব্যালকনি থেকে গল্পের শুরু হয়েছিলো। শিশির বুঝে যায় সে স্বপ্ন দেখছিলো এতক্ষণ।  শিশিরের দুচোখ জুড়ে আসে অশ্রু। কারন সোনেলা আর কেউ নয়, সোনেলা হলো শিশিরের একান্ত ভালোবাসার মানুষ। সোনেলা যে শিশিরের আত্মার আত্নীয়৷ তাই তো শিশিরের সব গুলা সপ্নেই সোনেলাই থাকে। কারন সে তার সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে শুধু সোনেলাকেই ভালোবেসেছিলো। কিন্তু সোনেলা তো শিশিরকে চায়না। সে শিশিরকে ভালোবাসেনা। এসব ভাবতে ভাবতে আর তার দেখা সপ্নের কথা মনে করে দুচোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে যায়। আল্লাহর কাছে দু হাত উঠে প্রার্থনায় যেনো শিশির ফিরে পায় সোনেলাকে কোনো অবৈধভাবে নয় বরং সহধর্মিণী হিসেবেই।

লেখক পরিচিতি: Md. Abidur Rahman (AR Khan), B.S S (Economics), M.B.A (MIS- DU-IBA)

গল্পঃ মাতৃরুপি বোন (Short Story)

নিলিমা কে খেলার মাঠের দিকে আসতে দেখেই শুভ দ্রুত হেটে তার দিকে গেলো আর বললো, আপু তোকে না বলেছি, আমি যখন মাঠে খেলবো তুই আসবিনা। তোর এক চোখ নেই দেখতে খুব বিশ্রি লাগে। আমার বন্ধুদের সামনে আমার লজ্জা লাগে। 

নিলিমা মন খারাপ করে বাসায় ফিরে গেলো। আসলে ছোটো ভাইয়ের খেলা দেখতে তার ভালোই লাগে। কিন্তু তার ছোটো ভাই শুভ তাকে দেখলেই এমন বিহ্যাভ করে। 

নিলিমা ঘরে এসে কান্না করতে থাকে। তার মনে পড়ে যায় ১০ বছর আগের কথা। যখন শুভ মাত্র চার বছর বয়সের। একদিন খেলতে খেলতে শুভ'র বাম চোখে একটা কঞ্চির মাথা ঢুকে যায় আর তার চোখটি অন্ধ হয়ে যায়। সবাই সেদিন শুভকে নিয়ে হাসপাতালে। ডাক্তার বললেন চোখ ট্রান্সপ্লান্ট করা পসিবল। কিন্তু কে শুভ কে চোখ দিবে। সবাই শুভ'র কেবিনে শুভকে ঘিরে কান্না করছে। এমন সময় নিলিমা বললো মা, আমি চোখ দিবো। আমার ভাইকে আমি জীবনের চেয়েও ভালোবাসি। আমার এক চোখ দিয়ে হলেও আমার ভাইকে আমি সুন্দর দেখতে চাই। নিলিমা কোনো বুঝ ই শুনলোনা। শেষ পর্যন্ত নিলিমার এক চোখের বিনিময়ে শুভ ফিরে পেলো দুই চোখ ভরে পৃথিবী দেখার অধিকার। 

নিলিমার অনুরোধ রাখতে গিয়ে কেউই শুভ কে বলে নাই যে তার ছোটো বয়সে ওমন কিছু হয়েছিলো। তাই শুভ ভুলে গিয়েছে সব সময়ের সাথে সাথে। 

সেদিন শুভ বাসায় ফিরে এসে রাতে খাওয়ার টেবিলে মা'কে বলে, "মা তোমার মেয়ে যেনো যখন তখন আমার বন্ধুদের সামনে না যায়। আর খেলার মাঠে যখন আমি খেলি ও যেনো না যায়।"

মা বললেন কেনো?

শুভ বললো ও গেলে সবাই কেমন চোখে তাকায়। আর আমার লজ্জা লাগে। আর বলোতো মা ওর এক চোখ নেই এটা দেখলে তো আমারই বিশ্রি লাগে। ও সবার সামনে ওভাবে না যেয়ে ঘরে বসে থাকলেই তো পারে।

নিলিমার চোখে পানি আটকালোনা, তবুও বললো। আচ্ছা ভাই। যাবোনা। তুই খেলিস। আমার চোখ নাই, দেখতে বিশ্রি লাগে আমি জানি। তাই আসলে আমার যাওয়াটাই ভুল হয়েছিলো। চুপ করে খেয়ে নে ভাই। 

শুভ এরপরেও বলে, "শুন আপু আমার রুমেও রাত বিরাত আসবিনা। আর আসলেও বলে ঢুকবি। কারন হঠাৎ তোকে দেখলে আমার কেমন যেনো লাগে।"

নিলিমার চোখের পানি আরো বাড়লো, বললো ঠিক আছে ভাই। তোর ইচ্ছা মতই সব হবে। 

এতক্ষণ সব কথা শুনলেন তাদের মা বাবা। কিছুই বললেন না। খাওয়া শেষ করে, শুভকে ডাকলেন মা বাবা। তার পরে প্রথমে নিলিমার একটা ছবি দেখালেন। শুভ বললো হায় আল্লাহ, এটা নিলিমা। তাইলে তার আরেক চোখ কই গেলো এখন। তখন তো দেখছি দুটা চোখ ই আছে। এখন কেনো নেই।

উত্তরে মা কিছু বললেন না।। তিনি  আরেকটা ছবি দেখালেন তাতে দেখা যাচ্ছে, শুভ'র ছোট্ট বেলার একটা ছবি তাতে মা বাবা নিলিমা সবাই তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে হসপিটালের একটা বেডের পাশে। যেখানে শুধুমাত্র শুভ'র এক চোখ নেই। কিন্তু মা, বাবা, নিলিমা সবার চোখ ঠিক আছে। 

শুভ শিউরে উঠলো। বললো কিভাবে আমার এ অবস্থা হয়েছিলো। 

এবার মা কথা বললেন। কঞ্চির খোচায় এরকম হয়েছিলো। 

মা আরো একটি ছবি বের করলেন তাতে দেখা যাচ্ছে আগের মতোই সবাই শুভ'র বেডের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। শুভর কানা চোখে একটি নতুন চোখ লাগানো হয়েছে। কিন্তু এবারের ছবিতে নিলিমার এক চোখ নেই। 

শুভ ঘামতে লাগলো। সে মা কে বললো মা, আমার চোখ কিভাবে ফিরলো। আর নিলিমা আপুর চোখ কই গেলো। 

মা আর জবাব দিলেন না। মায়ের দু গাল বেয়ে পানি পড়তে লাগলো। শুভ তাকিয়ে দেখে বাবা ও কান্না করছেন। 

শুভ সব বুঝে গেলো এক নিমিষে। এক দৌড়ে সে নিলিমার ঘরে চলে গেলো। নিলিমা ঘুমিয়ে গিয়েছিলো। শুভ যেয়েই নিলিমাকে জড়িয়ে ধরলো, আর কান্না করতে লাগলো। শুভ'র ধাক্কায় নিলিমার ঘুম ভেঙে গেলো। সে উঠে বসে শুভকে বুকে টেনে নিলো আর বললো কি হইছ ভাই। এভাবে কান্না করছিস কেনো। কিছু দেখ ভয় পাইলি না-কি। 

শুভ বলল, না আপু। শুধু একটা জবাব দাও। কেনো তুমি আমাকে সুন্দর করতে গিয়ে নিজে অসুন্দর হয়ে গেলে। নিলিমার দুচোখে জল চলে এলো। সে কিছুই বলতে পারলোনা। সে শুভ'র চোখের পানি মুছে দিলো নিজের ওড়না দিয়ে, আর শুধু বললো তুই যে আমার কলিজার টুকরা ভাই৷ 

পরদিন থেকে দেখা গেলো। নিলিমার হাত ধরে শুভ খেলার মাঠের এক কোনে বসে আছে। আর দুজনে মিলে সকলের খেলা দেখছে। নিলিমা অনেক বুঝিয়েও শুভকে খেলতে পাঠাতে পারলোনা। কারন সে আজকে আর খেলার মাঝে নয় বরং তার আপুর হাসিতেই আনন্দ খুঁজে পেয়েছে। 

পৃথিবীর সকল বোনদের প্রতি লেখকের শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা।