Showing posts with label universe. Show all posts
Showing posts with label universe. Show all posts

Thursday, February 29, 2024

যদি চায়ের কাপেতে জমে নিরবতা

ক্রিং ক্রিং ক্রিং ফোনটা বেজেই চলছে। মাহিন ফোনটি রিসিভ করতেই ওপার থেকে ইকবাল বলে মামা কোথায় তুই?

মাহিন: এইতো মামা স্কুল থেকে এলাম, কিছু কি বলবি। 
ইকবাল: রুদ্র দাঁ' র ছাদে আয় বিকালে আড্ডা দিবো, নসু মামা ও থাকবে। আবার মৃন্ময়ী রা আসছে। 
মাহিন: আচ্ছা দেখি কি করি।

রুদ্র'র ছাদে বিকালে আড্ডা জমে উঠেছে, মাহিন, ইকবাল রুদ্র দাঁ সবাই এসেছে। একটু পরে এসেছে মৃন্ময়ী আর তার বান্ধবী জোজো ও শৈপিল। মৃন্ময়ীকে দেখে মাহিন একটু হোচট খায়। কারন সে আগে স্কুল ড্রেসে তাকে দেখেছে কিন্তু এভাবে শাড়ি পরা কখনোই দেখেনাই। মাহিন মৃন্ময়ীর সামনে অনেকটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। 

শাহেদ স্যারের প্রাইভেট পড়ে বের হলেই ঝুম বৃষ্টি, মাহিন ছাতা নেয়নি সেদিন। কেউ কেউ বাসায় না গিয়ে বৃষ্টি কমার অপেক্ষায় প্রাইভেট শেষ হলেও রুমে অপেক্ষা করছিলো কেউ বা চলে গেছে। মাহিন বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিলো। এমন সময় কেউ এসে পাশে দাড়ালো। মাহিন পরিচিত সেন্ট পেয়ে মুখ ঘুরিয়েই দেখে মৃন্ময়ী। 
মাহিন তোতলায় আর বলে, কি খবর, কেমন আছো? মৃন্ময়ী হেসে বলে এই তো ভালো, এরকম তোতলাচ্ছো কেনো, আমি কি বাঘ না ভালুক। বলে হাসতে থাকে। মাহিনের বুকে আবারো অদৃশ্য ঝড়। কোমরে দুই হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লাস্যময়ী মৃন্ময়ীর দিকে তাকিয়ে থেকে ঝড়ের প্রাবল্য অনুভব করে মাহিন। 

মৃন্ময়ী বলে, তোমার ব্যাগে তো ছাতা আছে, আমাকে পৌঁছে দিয়ে আসোতো বাসায়, জরুরি কিছু কাজ আছে। মাহিন ঠিক আছে বলেই ছাতা বের করে মৃন্ময়ী কে নিয়ে রওনা হয়। কিন্তু মাহিন একটু দূরে দূরে হাটছিলো। হঠাৎ মৃন্ময়ী ওর হাত টেনে ধরে গায়ের সাথে মিশিয়ে দিয়ে বলে বৃষ্টিতে ভিজে যাবেতো। বলে গায়ে গা মিশিয়ে চলতে থাকে। মাহিনের তো বুকে হাতুড়ি পেটা হচ্ছে। বৃষ্টির জল তার গায়ে না পড়লেও মৃন্ময়ীর ছোঁয়ায় তার অন্তরে ঝড় বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সেই ঝড় তার বুক পর্যন্ত কাপিয়ে দিচ্ছে। শুধু মনে হচ্ছে এই বৃষ্টি যদি অনন্তকাল ধরে চলতো আর মৃন্ময়ীও তার পাশে এভাবে থাকতো চিরকাল। মৃন্ময়ীকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে ফিরে আসার সময় মৃন্ময়ী বলে "মাহিন তোমার ফোন নাম্বার টা দিয়ে যাও তো কখনো ইচ্ছে হলে কল দিতে হতে পারে"। মাহিন ফোন নাম্বার দিয়ে চলে আসে।

সেদিন রাতে, মাহিনের ফোনে হোয়াটসঅ্যাপে একটা মেসেজ আসে, " আমি মৃন্ময়ী" মাহিন তো খুবই অবাক, সে সাথে সাথে টেক্সট করে কেমন আছো? 
ওপাশ থেকে উত্তর আসে এইতো ভালো, তুমি কেমন?
মাহিন লিখে- ভালো আছি, এদিকে বুকে তার হাতুড়ি পেটা হচ্ছে। 
এভাবে চলতে থাকে টেক্সট। প্রতি রাতেই। অজস্র মেসেজে তাদের সময় কিভাবে মাঝরাত হয়ে যায়। তার পর ঘুমিয়ে যায় মাহিন।

এরমাঝে বন্ধু ইকবালের জন্মদিন। আয়োজন করা হয় ইয়োলো রেস্টুরেন্টে। মাহিন, মৃন্ময়ী, মৃন্ময়ীর দুই বান্ধবী জোজো আর শৈপিল, নসু মামা আর রুদ্র দাঁ সবাই আসে। কেক কাটা হয়। ইকবাল আর মৃন্ময়ী খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে একে অপরকে কেক খাইয়ে দেয়। এটা দেখে সবাই হাত তালি দেয় কিন্তু মাহিন হাত তালি দিলেও অনুভব করে তার বুকের ভেতর কেমন যেনো ফাকা ফাকা লাগতেছে। তাদের কেক পার্টি শেষ হলে ইয়োলো রেস্টুরেন্টের কার্ণিশে তারা ছবি তুলতে যায়। ছবি তুলার জন্যই এই কার্ণিশ টা করা হয়েছে।
এখানে উঠার সময় ইকবাল, নসু মামা, রুদ্র দাঁ সকলেই উঠে গেলেও মৃন্ময়ীদের উঠতে একটু কষ্ট হচ্ছিলো চিকন যায়গা দিয়ে। মাহিন হাত বাড়িয়ে হেল্প করতে গেলে জোজো হঠাৎ বলে উঠে মেয়ে দেখলেই সাহায্য করতে আসো আগ বাড়িয়ে। এগুলা আমরা বুঝি। সব ছেলেদেরই আমার চেনা আছে। এ কথা শুনে সকলেই হেসে উঠে।

নসু মামা হঠাৎ বলে মাহিন মেয়েদের একটু বেশিই হেল্প করতে চায়। সকলেই হাসে। 
এদিকে সব শুনেও মাহিন চুপ চাপ ই থাকে। সে ৪ তলার কার্ণিশে দাঁড়ানো মৃন্ময়ীর বাতাসে চুল উড়া দেখছে। সে মনে মনে ভেবে নেয় যে মৃন্ময়ীকে সে একদিন তার মনের কথা বলবে।

গ্রীষ্মের বন্ধ চলছে। সবাই বাসায় যার যার মতো পড়াশোনা আর ঘুরাঘুরি করে সময় কাটাচ্ছে। আবার একদিন ইকবাল তাদেরকে আড্ডা দেওয়ার জন্য ডাকে রুদ্র দাঁর বাসার ছাদে। সেদিন বিকালে মাহিন আসে, নসু মামা ও আসে, মৃন্ময়ীদের আসবার কথা থাকলেও তারা তখনও পৌঁছায়নি। নসু মামা বয়সে রুদ্র দাঁর চেয়ে বড় হলেও অনেক আড্ডা প্রিয় একজন মানুষ তাই সহজেই স্কুল পড়ুয়া ছেলেগুলোর সাথে মিশে থাকতে পারে। রুদ্র দাঁ তার সিগারেট ধরিয়ে একটু পরে মাহিনের হাতে দিলে মাহিন সেটা ইকবাল কে এগিয়ে দেয়। কারন সিগারেট খাওয়ার অভ্যেস তার নেই। এটা দেখে নসু মামা একটু জোক্স করে বলে আরে এক টান নিয়েই দেখো, একটু আধটু খেলে সবাই মরে যায়না। সবাই হেসে উঠে, মাহিন কোনোভাবেই নিতে চায়না কিন্তু সবার জোরাজুরিতে এক টান নিতেই সেখানে চলে আসে মৃন্ময়ীরা। এদিকে ওদের দেখে একটু অপ্রস্তুত হয়ে মাহিন কাশতে থাকে। মৃন্ময়ীরাও এসে সিগারেট ধরায় আর হাসাহাসি করতে থাকে।

সেদিন সন্ধ্যা নামলে মৃন্ময়ীরা চলে যায় আর ইকবাল ও মাহিন বাসার পথ ধরে। যেতে যেতে ইকবাল তাকে মৃন্ময়ীর অনেক গল্প শুনায়। মাহিন সব চুপচাপ শুনে আর ভাবে ইকবাল এতো কথা কিভাবে জানে। তাহলে কি ইকবালের সাথে মৃন্ময়ীর কোনো সম্পর্ক আছে? সে সাহস করে ইকবাল কে প্রশ্ন টা করতে পারেনা, কারন ইকবালের উত্তর যদি হ্যা হয় তাহলে সে কোনোভাবেই এটা মেনে নিতে পারবেনা। অবশ্য ইকবাল নিজে থেকেই বলে যে মৃন্ময়ীকে সে ভালোবাসে।

ইকবালের কাছ থেকে এমন কথা শুনার পরে মাহিন অনেকটাই হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়ে। কিন্তু ইকবালকে সে কিছুই বলেনা। কারন তার কাছে ভালোবাসার তুলনায় বন্ধুত্বটা অনেক বেশি কিছু ছিলো। সেদিন রাতে বাসায় ফিরে মাহিন চুপচাপ করে ভাবতে থাকে তার বিগত সময় গুলোর কথা। মৃন্ময়ীর মেসেজের রিপ্লাই ও দেয়না সেদিন মাহিন। 

মৃন্ময়ী সকাল থেকেই মাহিন কে কল দিচ্ছে কিন্তু মাহিন কল।রিসিভ করেনা। মাহিন টেবিলে বসে দেখছে একের পর এক কল গুলো বেজে বেজে শেষ হয়ে যাচ্ছে কিভাবে। 

কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ একটা আননোন নাম্বারের ফোন। মাহিন দ্রুত কল রিসিভ করলো কারন দারাজ থেকে তার একটা পার্সেল আসবার কথা। কিন্তু কল রিসিভ করতেই ওপার থেকে ভেসে এলো ঝাঝালো কন্ঠ মেয়েলী গলায়, "তোকে কত বার কল দিচ্ছি দেখস না, নাকি ইচ্ছে করেই কল ধরিস না, যে এখন কল দেওয়া মাত্র রিসিভ করলি?"
মাহিন স্তদ্ধ হয়ে গেলো, তার বুঝতে বাকি রইলোনা এটা মৃন্ময়ী। ওদিক থেকে মৃন্ময়ী কথা বলেই যাচ্ছে। মাহিনের কানে কথা যাচ্ছে বটে কিন্তু জবাব দেওয়ার মতো কিছু সে খুঁজে পাচ্ছেনা। মাহিন কে একেবারে চুপ থাকতে দেখে মৃন্ময়ী বললো, কিরে তুই কথা বলস না কেনো? 
এবার মাহিন বললো, "বলার অনেক কিছুই তো ছিলো, কিন্তু আর বলা হবেনা" বলেই কল কেটে দিলো।
মৃন্ময়ী হতভম্ব হয়ে গেলো, আর ভাবলো, তাহলে কি এদিকে অজান্তেই কেউ জ্বলে পুড়ে গেলো, কিন্তু সে আগে দেখেও বুঝলোনা।


অনেকদিন আর আড্ডায় যায়না মাহিন। স্কুল আর বাড়ি এভাবেই কাটছে সময়। কিছুদিন পরে, ইকবাল মাহিনকে ফোন দিলো।। ফোন দিয়ে বললো তোর সাথে কিছু কথা আছে রে আমার। সন্ধার পরে প্লিজ দেখা কর। মাহিন রাজি হলো। কিন্তু এক বুক হতাশা তার ভেতর। ইকবাল কি বলবে সেটা নিয়েই সে দুশ্চিন্তায় আছে।

সন্ধার পরে চায়ের দোকান থেকে দুই কাপ চা নিয়ে একটু দূরে দাঁড়িয়ে মাহিন ইকবালকে জিজ্ঞাসা করলো, বল কি বলবি। 
ইকবাল, "তুই কি জানিস মৃন্ময়ীর সাথে আমার সম্পর্ক চলছে?"
মাহিন, "হ্যা জানি তো, কেনো কি হয়েছে?"
ইকবাল, "মৃন্ময়ীর সাথে আমি আর সম্পর্ক রাখতে চাইনা, ও আমাকে বুঝেইনা, সম্পর্কের গভীরতাই বুঝেনা ও"
মাহিনের মনে মনে কেনো জানি বসন্তের হাওয়া বইতে লাগলো, তবুও মুখের ভাব রেখেই জিজ্ঞাসা করলো, "কি জন্য, সেটা তো বল, দেখি তোকে হেল্প করা যায় কিনা"
ইকবাল, "না-রে তেমন কিছু নয়। একটা রিলেশনে বর্তমান যুগে কিছু পার্সোনাল সময়ের প্রয়োজন আছে। যেহেতু ভালোবাসি তাই কিছুটা একান্ত সময় তো চাইতেই পারি, কিন্তু ও একেবারেই চুপ চাপ কিছুতেই আমাকে সুযোগ দেয়না। অথচ তার নাকি তার কাজিনের সাথে শারিরীক সম্পর্ক ও ছিলো" 
মাহিন কেমন যেনো চুপসে গেলো, তবুও বললো, "মামা কথা বলে দেখি, কি করা যায়।"
ইকবাল, "তুই আমার পক্ষ নিয়ে আর কথা বলতে যাসনা, তুই কথা বলবি বল। আমি ব্রেক আপ করে নিয়েছি"


মাহিন আগের মতোই আড্ডায় যায়না। সপ্তাহ খানেক পর আবার মৃন্ময়ীর ফোন, 
ফোন টা দেখতেই মাহিন রিসিভ করলো, "হেলো"
ওদিক থেকে কন্ঠস্বরে আকুলতা, "দেখা করবে একটু সন্ধার পরে সাগুফতায়"
মাহিন না বলতে যেয়েও পারলোনা, বললো, "ঠিক আছে আসবো আমি"

সন্ধার পরে সাগুফতায় দুজনে আসলো, মৃন্ময়ী কেমন যেনো শুকিয়ে গেছে, নীল একটা শাড়ি পরে এসেছে দেখা করতে। মাহিন তাকে দেখে যেনো চোখ ফেরাতে পারছিলোনা। জিজ্ঞাসা করলো, কেমন আছো মেঘা। 
মৃন্ময়ী অবাক হয়ে বললো, মেঘা মানে, আমি তো মৃন্ময়ী।।
মাহিন বললো, কোনো এক বাদল দিনে এক মেঘবালিকার সাথে হেটেছিলাম বৃষ্টিস্নাত রাস্তায়। তার ছিলো মেঘ কালো চুল, সেদিন ই মনে হয়েছিলো এই মেঘবালিকাটাকে চিরকাল পাশে নিয়ে চলতে চাই জীবনের শেষ পর্যন্ত।
মৃন্ময়ী কথা বলছেনা, চুপ করে আছে। 
মাহিন আবারো বললো, সে কি চুপ করেই থাকবে না-কি আমার সাথে। 
মৃন্ময়ী বললো, "তুমি কি বলতে চাইছো আমি জানি, কিন্তু তোমার বন্ধু ইকবাল বলেছেতো তোমাকে যে আমি ভালো মেয়ে নই, শুধু তোমাকেই না সে সকলকেই বলেছে এমন কথা"
মাহিন বললো, আমি কি বলেছি তোমায় এসব?
মৃন্ময়ী বললো, না- কিন্তু কেনো তুমি বলছোনা
মাহিন বললো, আমি তোমার অতীত নিয়ে কি করবো, আল্লাহ চাইলে ক্ষমা করে দিবেন। তুমি যদি ভুল করেও থাকো, তবুও এখন তো করছোনা
মৃন্ময়ী বললো, একটা সত্যি কথা বলি তোমাকে, যেহেতু তুমি বিশ্বাস করেছো আমায়। আমার আসলে এমন কোনো ঘটনাই নেই। বরং তোমার বন্ধু আমাকে তার সাথে একান্ত সময় কাটাতে বলছিলো তাই আমি তাকে বাঁধা দেওয়ার জন্যই এমন টা বলেছিলাম। 
মাহিন বললো, তাহলে তো আলহামদুলিল্লাহ।
মৃন্ময়ী বললো, "কি চলে যাবে না-কি?"
মাহিন বললো, "হ্যা যাবোই তো, কিন্তু আজ যে শুনতে চাই আমার বুকে একটা পাখিকে আটকাতে চাই, কিন্তু সেই খাচার তো দরজা নেই। পাখি কি থাকবে আজীবন, নাকি বেরিয়ে যাবে। "
মৃন্ময়ী চুপ হয়ে থাকলো। কিছুই বলছেনা। মাথা নিচু করে আছে
মাহিন তার দিকে তাকিয়ে দেখে মৃন্ময়ীর চোখে পানি, কিছুই বলছেনা। মাহিন তার হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে দিলো আর বললো, "চলোনা আমার মেঘবালিকা তোমায় নিয়ে হাটি চিরকাল। তোমায় পরম যত্নে বুকে ধারণ করে রাখবো চিরকাল, কখনো ছেড়ে যাবেনা তো আমায়"
মৃন্ময়ী মাহিনের হাত ধরলো আর বললো, চলো যাই।।

তার পর কেটে গেলো জীবনের ১২ টি বসন্ত। ইকবাল মালয়েশিয়া থেকে এসে মাহিনের বাসায় বেড়াতে এসেছে। মাহিন এখন সরকারী চাকরি করে। মাহিনের বাসায় মৃন্ময়ীকে দেখে তো সে অবাক।
খাওয়া দাওয়া শেষে এক সময় ফাঁকা পেয়ে ইকবাল মাহিনকে বললো, "কিরে মাহিন তোকে সব বললাম ওর চরিত্র সম্পর্কে, তবুও কেমনে কি এটা করলি"
মাহিন বললো, "সবাই তো জিততে চায়, আমি না হয় মৃন্ময়ীকে নিয়ে ঠকেই গিয়েছি" মৃন্ময়ী সেই সময় রুমে ঢুকেই সব শুনতে পেলো। ইকবাল কথা না বাড়িয়ে চলে গেলো।

সেদিন রাতে ছাদে চন্দ্রালোকিত চারিদিক।। একটা দোলনাই মাহিন আর মৃন্ময়ী দুই কাপ চায়ে ঠোট লাগিয়ে করছে রাত্রি বিলাস। নীল শাড়ি চাঁদের আলোয় আরো কালো হয়ে ফুটে উঠছে মৃন্ময়ীর শরীরে। তাকে করে তুলেছে অপার্থিব অপরুপা।। চারিদিকে শুনশান, যেনো চায়ের কাপেও জমেছে অজস্র নিরবতা। মাহিন তাকিয়ে আছে মৃন্ময়ীর দিকে, সেই মুগ্ধতা, যা এক যুগ পরেও পরিবর্তন হয়নাই, তৃপ্তি মেটেনাই।
হঠাৎ নিরবতা ভেঙে মৃন্ময়ী প্রশ্ন করলো, "আমাকে নিয়ে তাইলে ঠকেই গেছো তাইনা"
মাহিন চায়ের কাপ নামিয়ে রাখলো দোলনার পাশে, আর বললো, "ঠকেই তো গিয়েছি, মানুষ বার বার নতুনের মায়ায় পড়ে, কত বৈচিত্র‍্য আনে জীবনে। আর আমি, দেখো এক মেঘবালিকার মায়ায় পড়ে প্রতিদিন নতুন নতুন করে তারই মায়াই পড়ি"
মৃন্ময়ী মাহিনের ঠোটে হাত দিয়ে বললো, থামো এত বলতে নেই। আমার ভয় হয় যদি সময় শেষ হয়ে যায়।
মাহিন মুচকি তাকে বুকে টেনে নেয়, দুজনেই ঘুমিয়ে যায় দোলনায়। সৃষ্টিকর্তার অপার রহমত ঝরে পড়ে তাদের উপর। লেখকের শত সহস্র শুভকামনা তাদের জন্য। 

Writer: Md. Abidur Rahman, DU-IBA, based on a story of Mahbub Alam

Thursday, November 24, 2022

গল্পঃ মাতৃরুপি বোন (Short Story)

নিলিমা কে খেলার মাঠের দিকে আসতে দেখেই শুভ দ্রুত হেটে তার দিকে গেলো আর বললো, আপু তোকে না বলেছি, আমি যখন মাঠে খেলবো তুই আসবিনা। তোর এক চোখ নেই দেখতে খুব বিশ্রি লাগে। আমার বন্ধুদের সামনে আমার লজ্জা লাগে। 

নিলিমা মন খারাপ করে বাসায় ফিরে গেলো। আসলে ছোটো ভাইয়ের খেলা দেখতে তার ভালোই লাগে। কিন্তু তার ছোটো ভাই শুভ তাকে দেখলেই এমন বিহ্যাভ করে। 

নিলিমা ঘরে এসে কান্না করতে থাকে। তার মনে পড়ে যায় ১০ বছর আগের কথা। যখন শুভ মাত্র চার বছর বয়সের। একদিন খেলতে খেলতে শুভ'র বাম চোখে একটা কঞ্চির মাথা ঢুকে যায় আর তার চোখটি অন্ধ হয়ে যায়। সবাই সেদিন শুভকে নিয়ে হাসপাতালে। ডাক্তার বললেন চোখ ট্রান্সপ্লান্ট করা পসিবল। কিন্তু কে শুভ কে চোখ দিবে। সবাই শুভ'র কেবিনে শুভকে ঘিরে কান্না করছে। এমন সময় নিলিমা বললো মা, আমি চোখ দিবো। আমার ভাইকে আমি জীবনের চেয়েও ভালোবাসি। আমার এক চোখ দিয়ে হলেও আমার ভাইকে আমি সুন্দর দেখতে চাই। নিলিমা কোনো বুঝ ই শুনলোনা। শেষ পর্যন্ত নিলিমার এক চোখের বিনিময়ে শুভ ফিরে পেলো দুই চোখ ভরে পৃথিবী দেখার অধিকার। 

নিলিমার অনুরোধ রাখতে গিয়ে কেউই শুভ কে বলে নাই যে তার ছোটো বয়সে ওমন কিছু হয়েছিলো। তাই শুভ ভুলে গিয়েছে সব সময়ের সাথে সাথে। 

সেদিন শুভ বাসায় ফিরে এসে রাতে খাওয়ার টেবিলে মা'কে বলে, "মা তোমার মেয়ে যেনো যখন তখন আমার বন্ধুদের সামনে না যায়। আর খেলার মাঠে যখন আমি খেলি ও যেনো না যায়।"

মা বললেন কেনো?

শুভ বললো ও গেলে সবাই কেমন চোখে তাকায়। আর আমার লজ্জা লাগে। আর বলোতো মা ওর এক চোখ নেই এটা দেখলে তো আমারই বিশ্রি লাগে। ও সবার সামনে ওভাবে না যেয়ে ঘরে বসে থাকলেই তো পারে।

নিলিমার চোখে পানি আটকালোনা, তবুও বললো। আচ্ছা ভাই। যাবোনা। তুই খেলিস। আমার চোখ নাই, দেখতে বিশ্রি লাগে আমি জানি। তাই আসলে আমার যাওয়াটাই ভুল হয়েছিলো। চুপ করে খেয়ে নে ভাই। 

শুভ এরপরেও বলে, "শুন আপু আমার রুমেও রাত বিরাত আসবিনা। আর আসলেও বলে ঢুকবি। কারন হঠাৎ তোকে দেখলে আমার কেমন যেনো লাগে।"

নিলিমার চোখের পানি আরো বাড়লো, বললো ঠিক আছে ভাই। তোর ইচ্ছা মতই সব হবে। 

এতক্ষণ সব কথা শুনলেন তাদের মা বাবা। কিছুই বললেন না। খাওয়া শেষ করে, শুভকে ডাকলেন মা বাবা। তার পরে প্রথমে নিলিমার একটা ছবি দেখালেন। শুভ বললো হায় আল্লাহ, এটা নিলিমা। তাইলে তার আরেক চোখ কই গেলো এখন। তখন তো দেখছি দুটা চোখ ই আছে। এখন কেনো নেই।

উত্তরে মা কিছু বললেন না।। তিনি  আরেকটা ছবি দেখালেন তাতে দেখা যাচ্ছে, শুভ'র ছোট্ট বেলার একটা ছবি তাতে মা বাবা নিলিমা সবাই তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে হসপিটালের একটা বেডের পাশে। যেখানে শুধুমাত্র শুভ'র এক চোখ নেই। কিন্তু মা, বাবা, নিলিমা সবার চোখ ঠিক আছে। 

শুভ শিউরে উঠলো। বললো কিভাবে আমার এ অবস্থা হয়েছিলো। 

এবার মা কথা বললেন। কঞ্চির খোচায় এরকম হয়েছিলো। 

মা আরো একটি ছবি বের করলেন তাতে দেখা যাচ্ছে আগের মতোই সবাই শুভ'র বেডের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। শুভর কানা চোখে একটি নতুন চোখ লাগানো হয়েছে। কিন্তু এবারের ছবিতে নিলিমার এক চোখ নেই। 

শুভ ঘামতে লাগলো। সে মা কে বললো মা, আমার চোখ কিভাবে ফিরলো। আর নিলিমা আপুর চোখ কই গেলো। 

মা আর জবাব দিলেন না। মায়ের দু গাল বেয়ে পানি পড়তে লাগলো। শুভ তাকিয়ে দেখে বাবা ও কান্না করছেন। 

শুভ সব বুঝে গেলো এক নিমিষে। এক দৌড়ে সে নিলিমার ঘরে চলে গেলো। নিলিমা ঘুমিয়ে গিয়েছিলো। শুভ যেয়েই নিলিমাকে জড়িয়ে ধরলো, আর কান্না করতে লাগলো। শুভ'র ধাক্কায় নিলিমার ঘুম ভেঙে গেলো। সে উঠে বসে শুভকে বুকে টেনে নিলো আর বললো কি হইছ ভাই। এভাবে কান্না করছিস কেনো। কিছু দেখ ভয় পাইলি না-কি। 

শুভ বলল, না আপু। শুধু একটা জবাব দাও। কেনো তুমি আমাকে সুন্দর করতে গিয়ে নিজে অসুন্দর হয়ে গেলে। নিলিমার দুচোখে জল চলে এলো। সে কিছুই বলতে পারলোনা। সে শুভ'র চোখের পানি মুছে দিলো নিজের ওড়না দিয়ে, আর শুধু বললো তুই যে আমার কলিজার টুকরা ভাই৷ 

পরদিন থেকে দেখা গেলো। নিলিমার হাত ধরে শুভ খেলার মাঠের এক কোনে বসে আছে। আর দুজনে মিলে সকলের খেলা দেখছে। নিলিমা অনেক বুঝিয়েও শুভকে খেলতে পাঠাতে পারলোনা। কারন সে আজকে আর খেলার মাঝে নয় বরং তার আপুর হাসিতেই আনন্দ খুঁজে পেয়েছে। 

পৃথিবীর সকল বোনদের প্রতি লেখকের শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা। 

গল্পঃ নিশাচর। (Horor Short Story)

টাইপ- অনুগল্প।

মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো শিশিরের। কেমন যেনো একটা খস খস আওয়াজ হচ্ছে পাশের রুমে। শিশির উঠে বসে বিছানায়। সে ভাবে পাশের রুমে থাকা তার ভাইয়া ভাবি সম্ভবত উঠে কোনো কাজ করছেন। এমন সময় তার মনে পড়ে ভাইয়া ভাবি তো নেই। তারা সবাই তো বেড়াতে গেছেন দুইদিন পরে আসবেন। এই বাসায় তারা সম্প্রতি উঠেছে। চার তলার উপরে সিমসাম একটা ফ্লাট।

তো যাই হোক, শিশির ভাবলো উঠে দেখে আসি কিসে শব্দ করছে। শিশির হাতড়িয়ে তার মোবাইল টা খুঁজে। তার পর মোবাইল টা নিয়ে নিজের রুমের দরজা খু


লে তার ভাইয়া ভাবির রুমে যেয়ে আলো জ্বালতেই দেখে একটা বৃদ্ধ কঙ্কালসার মানুষ বসে আছে, দেখতে খুবই ভয়ানক। চোখ দুটি জ্বলছে লাল টকটকে হয়ে, লোকটি কঙ্কালসার হলেও তার গলার কাছ টায় কাটা সেখান দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। শিশির কিছু ভেবে উঠার আগেই লোকটি শিশিরের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। শিশির ভয়ে জ্ঞান হারানোর উপক্রম সে তাড়াতাড়ি তার নিজের রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়। আর ভাবে কি হচ্ছে এসব স্বপ্ন দেখছে না তো। 

শিশির তার রুমের লাইট জ্বালাতে যায়। কিন্তু লাইট জ্বলছেনা। অথচ ফ্যান চলছে ঠিকই। শিশিরের রুমের সাথে একটা ব্যালকনি আছে। হঠাৎ সেদিকে নজর যায় শিশিরের। শিশির দেখতে পায় একটা লোমস শরীরের গরিলার মতো কেউ দাঁড়িয়ে আছে। শিশিরের দিকে লোমস শরীরের জীবটি তাকিয়ে হেসে দেয়। শিশির দেখতে পায় জীবটি আসলে ব্যালকনিতে নয় বরং সে ব্যালকনি সমান উচু। চার তলা বাসার নিচে থেকেই হয়তো দাঁড়িয়ে আছে। 

সে দিকে তাকিয়ে শিশিরের সারা শরীর যেনো গুলিয়ে যায়। ধপাস করে নিচে বসে পড়ে, হঠাৎ দেখতে পায় খাটের নিচে একটা মেয়ে বসে আছে। মেয়েটার চোখ গুলাও লাল হয়ে আছে। আর তার গালের পাশে বিশাল একটা গর্ত। নিকষকালো অন্ধকারেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে সব কিছু। শিশির জ্ঞান হারায়। 

পরের দিন সকালে শিশিরের জ্ঞান ফিরে আসে নিজে থেকেই। তার ভাইয়া ভাবি তখনও আসেনাই। শিশির ভাবে এখন দিনের বেলা, রাতে কি সব স্বপ্ন দেখলাম। কারন শিশির অনেক সাহসী এ কথা সত্য। শিশির হাত মুখ ধুতে যায়। ওয়াশরুমের আয়নায় নিজেকে দেখতে থাকে। তখনই শিশিরের চোখের সামনে আয়নার ভেতরে কালকের সেই মেয়েটার ছবি দেখা যায়। শিশির যেই কিনা থুথু ফেলতে যায় বেসিনে সেই আয়না থেকে মেয়েটার একটা হাত বেরিয়ে আসে। শিশিরের মুখে প্রবল জোরে একটা থাপ্পড় দেয় মেয়েটা। শিশির প্রচন্ড ভয় পেয়ে চলে আসে আর কিচেন থেকে হাত মুখ ধুয়ে নেয়।

এখন শিশির আকাশ পাতাল ভাবতে শুরু করে। সে ভাবে এই ঘরে অশরীরী আত্মা আছে, কিন্তু কিভাবে আছে। কেনো আছে। কারন শিশির জানে যে এই সকল আত্মারা হয় কোনো প্রয়োজনে অথবা কোনো সুযোগ পেলেই থাকে। হয় তাদের প্রয়োজন পূর্ণ করে দিলে অথবা তাদের থাকার সুযোগ নষ্ট করে দিলে তারা থাকতে পারেনা। 

শিশির দিনের বেলাতে প্রতিটা রুম খুঁজতে থাকে। শেষ পর্যন্ত কিছুই পায়না। তখন সে অন্যান্য ফ্লাটে সবাইকে জিজ্ঞাসা করে, কিন্তু সবাই বলে তোমার দেখার ভুল। আর সকলের কাছে জিজ্ঞাসা করে শিশির বুঝে যায় তাদের ফ্লাটের ভাড়া মাত্র হাফ অন্যান্য ফ্লাট থেকে।। শিশির বুঝে যায় যে শুধুমাত্র এই ফ্লাটেই সমস্যা আর এ জন্যই ভাড়া কম। কারন কেউ ই এই ফ্লাটে এসে থাকতে পারেনা। 

শিশির বাড়ির দারোয়ানের কাছে তাদের ফ্লাট নিয়ে জিজ্ঞাসা করে। 

দারোয়ান বলে, "তেমন কিছুই জানিনা। শুধু আজ থেকে ১১ বছর আগে ঐ ফ্লাট থেকে এক ভাড়াটিয়া পরিবার সবাই উধাও হয়ে যায়। তাদের লাশও পাওয়া যায়না যে নিশ্চিত হবে তারা নিহত। অথবা তারা কোথাও গেছে কিনা সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী সেটাও পাওয়া যায়না। অবশ্য আমাদের মালিক অনেক টাকা পয়সা খরচ করে ব্যাপারটা নিয়ে আর অগ্রসর হতে দেননি পুলিশ কে, কারন তাতে অন্যান্য ফ্লাটের সদস্য হারাতে হতো হয়তোবা।"

শিশিরের মনে খটকা লাগে। সে তার এক PBI এ চাকরি করা বন্ধুকে সব খুলে বলে। তার বন্ধু খুবই এক্সাইটেড ছিলো। ঐ দিনই সে শিশিরদের বাসায় চলে আসে। আর শিশিরের বাসার সব যায়গায় তন্নতন্ন করে খুঁজে। কিন্তু কিছুই পায়না। এমন সময় তাদের নজরে পড়ে আলমারির রাখার যায়গাটা। কারন যেখানে আলমারির রাখা সেই দেওয়াল টা অনেক উচু। দেখেই মনে হচ্ছে খুবই ODD, অথচ কোনো কারন ছাড়া এরকম দেয়াল উঁচু রাখার কোনো প্রয়োজন ছিলোনা। তখন শিশিরের ঐ বন্ধু তার ডিপার্টমেন্ট এ জানায়। পিবিআই তাদের টিম নিয়ে এসে হাজির। তারা দেওয়ালের ঐ অংশ ভেঙে সবাই তাজ্জব হয়ে যায়৷ কারন সেখানে তিনটি কঙ্কাল। একজন সিনিয়র অফিসার দেখেই বললেই এখানে একটি বৃদ্ধ, একটি যুবতি মেয়ে আর একটি যুবক ছেলের কঙ্কাল। 

বাড়ির মালিক ও সব শুনে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসলো। কিন্তু পিবিআই কর্মকর্তা গন তাকে গ্রেফতার করে নিলেন। 

পরে জিজ্ঞাসাবাদে বাড়ির মালিক সবকিছুই স্বীকার করে নিলেন যে এই খুনে তার হাত ছিলো। 

তবে সেদিনের পর থেকে শিশিরের সাথে বা আর কারো সাথে ঐ ফ্লাটে কোনো অস্বাভাবিক কিছুই ঘটেনাই

Tuesday, April 14, 2020

ধূমকেতু একটি মহাজাগতিক বিস্ময়

ধূমকেতু- Comet
ধুমকেতু (ইংরেজি: Comet) যা ধুলো, বরফ ও গ্যাসের তৈরি এক ধরনের মহাজাগতিক বস্তু। ধূমকেতু একটি ক্ষুদ্র বরফাবৃত সৌরজাগতিক বস্তু যা সূর্যের খুব নিকট দিয়ে পরিভ্রমণ করে।

একটি ধূমকেতুর পর্যায়কাল কয়েক বছর থেকে শুরু করে কয়েকশ’ হাজার বছর পর্যন্ত হতে পারে। ধারণা করা হয় স্বল্পকালীন ধূমকেতুর উৎপত্তি কুইপার বেল্টথেকে যার অবস্থান নেপচুনের কক্ষপথের বাইরে এবং দীর্ঘকালীন ধূমকেতুর উৎপত্তি ওরট মেঘ থেকে, যা সৌরজগতের বাইরে একটি বরফময় বস্তুর গোলাকার মেঘ। আমাদের সৌরজগতের বড় গ্রহগুলোর ( বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুন) অথবা সৌরজগতের খুব কাছ দিয়ে পরিক্রমণকারী নক্ষত্রেরকারণে ওরট মেঘে যে মাধ্যাকর্ষণ বল ক্রিয়া করে তাতে বস্তুগুলো সূর্যের দিকে ছুটে আসে এবং তখনি কমার উৎপত্তি হলে আমরা ধূমকেতু দেখি।

পর্যায়কাল অনুসারে ধুমকেতুকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়, যথা স্বল্পকালীন ধুমকেতু এবং দীর্ঘকালীন ধুমকেতু। 
স্বল্পকালীন ধূমকেতু হল যাদের পর্যায়কাল ২০০ বছরের কম। সাধারণত এগুলো গ্রহগুলোর মত একটি উপবৃত্তাকার তলে ঘোরে। এসব ধূমকেতুর অপসূর দূরত্ব হয় বৃহস্পতির কক্ষপথের বাইরে। যেমন হ্যালীর পর্যায়কাল ৭৬ বছর এবং এর অপসূর নেপচুনের কক্ষপথের বাইরে।
দীর্ঘকালীন ধূমকেতুর পর্যায়কাল ২০০ বছর থেকে কয়েক লক্ষ বছর হতে পারে এবং এদের কক্ষপথের উৎকেন্দ্রিকতা অনেক বেশি। এসব ধূমকেতু কোনও বড় গ্রহের কাছাকাছি এলে সৌরজগত থেকে বিক্ষিপ্ত হতে পারে এবং তখন এদের পর্যায়কাল থাকে না ।

হ্যালির ধুমকেতু- Hally's Comet 
ধারণা করা হয় স্বল্পকালীন ধূমকেতুর জন্ম বামন গ্রহগুলো বা সেন্টর থেকে এবং কুইপার বেল্ট ও নেপচুনের কক্ষপথের বাইরের এলাকায় যে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন বস্তুর চাকতির মত এলাকা আছে সেখান থেকে, প্রায় ৩০ থেকে ৫০ জ্যোতির্বিদ্যার একক দূরত্বে; দীর্ঘকালীন ধূমকেতুর জন্ম ওরট মেঘ থেকে যা সৌরজগতের সবচে দূরের এলাকা এবং এখানে বরফপিণ্ডের মত অনেক বস্তু গোলাকার কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান বলে মনে করা হয়।

সুর্যের কাছে চলে গেলে কোনো ধুমকেতু ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে যায়। সাধারণত, ধুমকেতুর অস্তিত্ব এবং আচরণ সব কিছুই বিস্ময়কর। প্রাচীন ইতিহাসবিদ ইফোরাস প্রথম খ্রি. পূর্ব ৪র্থ শতকে বলেন একটি ধূমকেতু দুইভাগে ভাগ হয়ে গেছিল। সেপ্টেম্বর (1882 II) ধূমকেতুর নিউক্লিয়াস সূর্যের খুব কাছে গিয়ে চারটি স্বতন্ত্র নিউক্লিয়াসে ভাগ হয় যা ২৫০০ থেকে ২৯০০ সালের মধ্যে আবার ফিরে আসবে। এছাড়া ১৯৯৫ সালে Comet 73P/Schwassmann-Wachmann 3 ধূমকেতু ভেঙ্গে যেতে শুরু করে। এগুলোকে ক্রেজ সানগ্রেজার পরিবারের ধূমকেতু বলা হয়।

তাছাড়া বিস্ময়কর প্রাণী ডাইনোসোর বিলুপ্তির সাথেও এই ধুমকেতুর যোগসাযোগ আছে।  লুইস ও ওয়াল্টার আলভারেজের মতে ৬.৫ কোটি বছর আগে কোনও ধূমকেতু বা বৃহৎ কোন উল্কাপাতের ফলে ডাইনোসরসহ অনেক প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যায়। অনেকের ধারণা পৃথিবীর জন্মের পর যথেষ্ট পরিমাণ পানি ধূমকেতু থেকে এসেছিল। সম্প্রতি ২০১৩ সালের ২৮ নভেম্বর ধূমকেতু ISON অনুসূর দূরত্বে এসে হারিয়ে যায়। ধারণা করে হচ্ছে এটি সূর্যের সম্মুখে এসে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে।
Deep Impact মহাকাশযান থেকে তোলা 
Tempel 1 ধূমকেতুর নিউক্লিয়াসের ছবি। 
যেটির নিউক্লিয়াসটি চওড়ায় ৬ কিমি
হ্যালির ধূমকেতু কাইপার বেল্ট থেকে আসলেও বেশীর ভাগ ধূমকেতুর উৎস হচ্ছে ওর্ট মেঘ। অনুমান করা হয় মূল সৌর জগতের বাইরে, প্রায় ৫০,০০০ জ্যোতির্বিদ্যার একক দূরত্বে অবস্থিত, এই অঞ্চলে হচ্ছে প্রায় এক ট্রিলিয়ন বা দশ লক্ষ কোটি ধূমকেতুর বসবাস। কোন কোন সময়ে সৌর জগতের কাছাকাছি কোন নক্ষত্র আসলে সেটার মাধ্যাকর্ষণজনিত অভিঘাতে এই ধূমকেতুগুলি সূর্যের দিকে রওনা হয়। সূর্যের কাছাকাছি পৌঁছাতে সেগুলির কয়েক মিলিয়ন বা কয়েক দশক লক্ষ বছর লেগে যায়। এই ধূমকেতুগুলির কক্ষপথ অধিবৃত্ত (প্যারাবলিক) বা পরাবৃত্ত (হাইপারবলিক) আকারের হয়ে থাকে। ওর্ট মেঘ থেকে আগত বেশীরভাগ ধূমকেতুই পুনরায় ফিরে আসে না।
কিছু ধূমকেতুর পর্যায়কাল বড় গ্রহগুলোর মাধ্যাকর্ষণ বলের প্রভাবে পরিবর্তিত হতে পারে। যেমন 11P/Tempel-Swift-LINEAR ধূমকেতু ১৮৬৯ সালে আবিষ্কৃত হলেও ১৯০৮ সালের পর আর দেখা যায় নি কারণ হল বৃহস্পতি। পরে ২০০১ সালে LINEAR দ্বারা পুনরায় আবিষ্কৃত হয়।
বেশিরভাগ ধুমকেতুর নিউক্লিয়াস (ধুমকেতুর কেন্দ্র) ৬মাইল বা ১০ কি.মি. এর কম হয়ে থাকে। কোনো ধুমকেতুর বিস্তৃতি নির্ভর করে সেটি সূর্য থেকে কত দূরে অবস্থান করছে। যখন কোনো ধুমকেতু সূর্যের কাছাকাছি যায় তখন তার নিউক্লিয়াসে অবস্থিত বরফ বাষ্পীভূত হয়ে শুরু করে। আর নিউক্লিয়াসের বরফ বাষ্পীভূত হওয়ার কারণে Coma’র বিস্তৃতি বেড়ে গিয়ে হয়ে যায় ৫০,০০০ মাইল বা প্রায় ৮০,০০০কি.মি. এর ফলে ধুমকেতুর লেজ গুলোর বিস্তৃতি বেড়ে গিয়ে প্রায় ৬০০,০০০ মাইল বা প্রায় ১মিলিয়ন কি.মি. হয়ে যেতে পারে।
লিখেছেনঃ Md. Abidur Rahman, Institute of Business Administration, Dhaka University.